জামিয়া পরিচিতি

ধর্মীয় শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা মানুষ গড়ার সবোর্ত্তম হাতিয়ার এবং শিক্ষা সমাজ পরিবর্তনেরও বলিষ্ঠ হাতিয়ার। কেবল জাতীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রণীত নৈতিকতাসমৃদ্ধ ধর্মভিত্তিক শিক্ষাই এই মেরুদণ্ড ও হাতিয়ারকে সুদৃঢ় করতে সক্ষম। শিক্ষা প্রয়োজনীয় হলেও আদর্শ বিবর্জিত নীতি—নৈতিকতাহীন শিক্ষা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, শিক্ষা কখনো মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্ব উপহার দিতে পারে না।
ইউরোপ, আমেরিকার বর্তমান সামাজিক অবস্থা এর বাস্তব প্রমাণ। পাশ্চাত্য সমাজ আজ যে আদর্শ সঙ্কটে নিমজ্জিত, এর একমাত্র কারণ হচ্ছে ধমীর্য় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি উদাসীনতা। সুতরাং নীতিবহির্ভূত শিক্ষা কারও কাম্য হতে পারে না।
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এ দেশে ইংরেজ বেনিয়াদের শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। শুরু হয় এ দেশের মুসলমানদের ওপর চতুর্মুখী নিযার্তন। চলতে থাকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ইংরেজদের আগ্রাসনের শিকার হয় এ দেশের ঐতিহ্যবাহী ধমীর্য় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। তাদের ষড়যন্ত্রে বিলুপ্ত হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা ধর্মভিত্তিক একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। মূলত বৃটিশ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পূর্বে এ দেশে একমাত্র ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাই চালু ছিল। বর্তমানের মতো মাদরাসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা বলতে পৃথক কোনো শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না।
ইংরেজ সরকার ইসলামী শিক্ষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ সালে বৃটিশদের হাতে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে উক্ত ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত হয়। বৃটিশরা এ দেশে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল একটি সুনির্দিষ্ট নীতি, আদর্শ ও লক্ষকে সামনে রেখে। ১৮৩৫ সালের শিক্ষা পরিকল্পনার প্রধান দিক—নির্দেশনাকারী লর্ড মেকলে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের অবশ্যই যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়, যারা আমাদের ও আমাদের শাসিতদের মধ্যে দূতের কাজ করবে। এরা এমন একধরনের মানুষ হবে যারা রক্তে ও গায়ের রঙে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তা—ভাবনা, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।’ এভাবে বৃটিশদের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সমাজে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী জনতার বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আলেম সমাজ ছিলেন এই নির্যাতনের মূল শিকার। একপর্যায়ে এই উপমহাদেশ আলেমশূন্য হয়ে পড়ে।
যখন বৃটিশ বেনিয়াদের শাসন—শোষণে মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধমীর্য় শিক্ষা সংস্কৃতিতে নেমে আসে মহাবিপর্যয় এবং মুসলিম সমাজ হয়ে যায় ধমীর্য় নেতৃত্বশূন্য, তখন নববী ইলমের আলোয় আলোকিত একদল মানুষ তৈরির লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই জনসাধারণের সহযোগিতায় ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী সর্বজনীন বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দ। সুনির্দিষ্ট ব্যাপক লক্ষ—উদ্দেশ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি সর্বজন সমাদৃত হয়ে ওঠে এবং একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারুল উলূমের শিক্ষাধারা অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে অসংখ্য দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও স্বাধীনতার আগে ও পরে এই ধারায় গড়ে ওঠে অনেক প্রতিষ্ঠান। যেগুলো শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে আদর্শ জাতি গঠনসহ মানুষের ধমীর্য় প্রয়োজন পূরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে।
জামিয়া আরাবিয়া ইমাদাদুল উলূম ফরিদাবাদ দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষা ধারায় পরিচালিত একটি বৃহত্তম দীনি প্রতিষ্ঠান। যা অর্ধশতাব্দী কালেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মুসলমানদের ধমীর্য় প্রয়োজন পূরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। সময়ের প্রয়োজনেই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য জরুরি :

নাম ও অবস্থান :

পুরো নাম : জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ।
কুতুবে আলম, শায়খুল মাশায়েখ হযরত মাওলানা হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.—এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ—পূর্বপ্রান্তে বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে গেণ্ডারিয়া থানাধীন ১১/১২ হরিচরণ রায় রোড (মাদরাসা রোড) ফরিদাবাদ—এ প্রায় সাড়ে পাঁচবিঘা জমির ওপর এ প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান।

প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা :

১৩৭৫ হিজরী মোতাবেক ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই উক্ত প্রতিষ্ঠানের মুতাওয়াল্লী ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পরবতীর্তে তাঁর অসুস্থতার কারণে তাঁরই পরামর্শক্রমে বিশিষ্ট বুযুর্গ হযরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. এই জামিয়া পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘদিন পরিচালনা করেন।

জমিদাতা :

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর মরহুম কবির উদ্দিন মোল্লা কতৃর্ক ওয়াকফকৃত সাড়ে পাঁচ বিঘা জমির ওপর এই খালেস দীনি প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে ক্ষুদ্রাকার থাকলেও অতি অল্প সময়ের মধ্যে জামিয়ার রূপ বৃহদাকার ধারণ করে এবং সারাদেশে এর সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে।

বৈশিষ্ট্য :

এটি একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আল্লাহর ওপর ভরসা এবং মুসলিম জনগণের সাহায্য—সহযোগিতা এর যাবতীয় খরচ নিবার্হের একমাত্র অবলম্বন। এতদসত্ত্বেও জামিয়ার গোরাবা ফান্ড থেকে গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের সারা বছর ফ্রি খোরাকী দেওয়া হয়। প্রয়োজনে অন্যান্য আর্থিক সাহায্যও করা হয়। ধনী—গরিব নির্বিশেষে সবাইকে জামিয়ার পক্ষ থেকে পড়াশুনার সুবিধার্থে প্রতি এক—শিক্ষাবর্ষের জন্য কিতাবপত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছাত্রাবাসে সকল ছাত্রের জন্য ফ্রি থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্রদের আমল—আখলাক ও পড়া—শোনার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখার জন্য বিচক্ষণ ও সুযোগ্য আসাতিযায়ে কেরাম সার্বক্ষণিক নেগরানিতে নিয়োজিত রয়েছেন।

ছাত্রদের তারবিয়াত :

সুন্নাতের তালীম : ইলম অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রদের সুন্নাতের অনুসারী হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সুন্নাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। নিয়মিত বাদ আসর সুন্নাতের তালীম ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
নামাযের মশক : ঈমানের পর মুমিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামায। নামায সঠিক ও সুন্দর হলে মুমিনের সব আমলে সৌন্দর্য ও দুরস্তী এসে যায়। তাই হাদীস ও ফিকহের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের নামায যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ছাত্রদের তার বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

তারবিয়াতী জলসা :

তালিবুল ইলমের মূল পরিচয় তালিবুল ইলম ওয়াল আমাল। ইলম অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রদের আমলের সার্বিক উন্নতি বিধান, এত্তেবায়ে সুন্নত, আকাবিরের অনুকরণ ও চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে সপ্তাহে সোমবার তারবিয়াতী জলসা অনুষ্ঠিত হয়। তা ছাড়া জামিয়ার উস্তাদগণ দরসের ফাঁকে ফাঁকে তারবিয়াত প্রদান করে থাকেন। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে জামিয়ার সম্মানিত মুহতামিম সাহেব দা.বা. মর্মস্পশীর্ তারবিয়াতী নসীহত এবং দেশ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যণের জন্য দুআ করে থাকেন।

দাওয়াত ও তাবলীগ :

ওলামায়ে কেরামের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইলমে দীনের প্রচার এবং দীনের দাওয়াত ও তাবলীগ। ছাত্রদের মাঝে এ দায়িত্ববোধের জাগরণ ও তাতে অভ্যস্ত করার লক্ষ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের বিভিন্ন তারতীবে অংশগ্রহণ করা হয়। মাদরাসা খোলা অবস্থায় উস্তাদগণের তত্ত্বাবধানে সাপ্তাহিক ২৪ ঘণ্টার দাওয়াতী জামাত বের হয়। উস্তাদগণ সাময়িক ছুটিতে ৩/৭/১০/১৫ দিন দাওয়াতী কাজে শরীক হওয়া এবং বার্ষিক ছুটিতে চিল্লায় বের হওয়ার তাগিদ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া শিক্ষা সমাপন করা ছাত্রদের সালে বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। ফলে বহু ছাত্র যথারীতি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে শরীক হয়ে ওয়ারাছাতে নববীর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এমনিভাবে ছুটিতে এলাকার মানুষদের মাঝে দীনি জরুরি মাসআলা—মাসায়েলের তালীম, অযু ও নামাযের বাস্তব অনুশীলনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে থাকেন।

জামিয়ার বহুমুখী খিদমত :

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছে। যুগ জিজ্ঞাসার জবাব ও দৈনন্দিন মাসায়েলের সমাধানের লক্ষ্যে জামিয়ার ফতোয়া বিভাগ থেকে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই ফতোয়া প্রদান করা হয়। সাপ্তাহিক প্রশ্নোত্তর মজলিসের ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রতি বছর ফারগীনদের বিরাট এক জামাত জামিয়া থেকে বের হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় দীনের সংরক্ষণ করছেন। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র এমনকি গ্রাম—গঞ্জেও জামিয়ার শিক্ষক ও ফারগীন ছাত্রগণ বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে দীনি শিক্ষা আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। কুরআনে কারীমের সঠিক সংরক্ষণের নিমিত্ত বহু হিফযখানা স্থাপন করছেন। দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্জলের দীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত লোকদের মাঝে কোরআনের বিশুদ্ধ শিক্ষার প্রচলন ও জরুরি মাসআলা—মাসায়েল শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জামিয়ার উস্তাদ ও ফারগীন ছাত্রগণ বহু নূরানি মক্তব প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষদের কাছে দীনের আলো পেঁৗছানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ধমীর্য় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বার্ষিক ওয়াজ—মাহফিলের ব্যবস্থা করছেন। এভাবে দীনের প্রচার—প্রসারের গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।
মাতৃভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় বহুগ্রন্থ রচনা করে দাওয়াত ও তাবলীগের ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। জামিয়ার উস্তাদ ও ফারগীনদের বিভিন্ন বিষয়ের বহু গ্রন্থ বিদ্যমান রয়েছে। তা ছাড়া প্রতি রমযানে ও কুরবানীর ঈদে রমযান ও কুরবানী সংক্রান্ত মাসায়েলের বই জামিয়ার পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়।
জামিয়ার বহু ছাত্র সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে দীন প্রচারের কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তাদের কলাম স্থান পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত চলছে জামিয়ার শিক্ষক ও ছাত্রগণ এ কাজে জড়িত হয়ে দীনের প্রচার—প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। সহী তরীকার পীর—মুরীদির মাধ্যমে পীরবেশী প্রতারকদের খপ্পর থেকে মানুষদের রক্ষা করে বিশুদ্ধ পথে পরিচালনার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুযোর্গে আক্রান্ত লোকদের সহযোগিতায় জামিয়ার উস্তাদ ও ছাত্রগণ বরাবরই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছেন।
আল্লাহ তাআলা জামিয়াকে আরও উন্নতি দান করুন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমত করার তাওফীক দান করুন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের খেদমতে দুআর আন্তরিক আবেদন রইল।

জামিয়ার ভবনসমূহ : অন্যান্য কওমি মাদরাসার মতো ফরিদাবাদ জামিয়ার সূচনা হয় ক্ষুদ্র পরিসরেই। এরপর চলতে থাকে শিক্ষার উন্নতি ও স্থাপনার অগ্রগতি, চলতে চলতে এ জামিয়া যেমন একটি ঐতিহ্যবাহী ইলমে দীনের ফোয়ারা ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত হয়, তেমনি শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুপাতে জামিয়ার স্থাপনা এবং ভবনও বাড়তে থাকে। বর্তমানে জামিয়ার ভবন সংখ্যা নয়টি। ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দিত রূপে। স্থাপিত হয়েছে পরস্পর সংযুক্ত করে মাদরাসার চারপাশে ঘিরে এমনভাবে, যে কেউ এক ভবনে প্রবেশ করলে সাত ভবন ঘুরে বের হতে পারে। ভবনগুলোর নামকরণ করা হয়েছে সাত জন বিশিষ্ট সাহাবীর নামে। প্রত্যেক ভবনের রুম স্বতন্ত্র নম্বরযুক্ত। উস্তাদগণের রুমের সামনে সংক্ষিপ্ত পরিচিতসহ নেমপ্লেট লাগানো আছে।
১। দারে আবূ বকর রাযি. : এটি জামিয়ার উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত।
এ ভবন দিয়েই মাদরাসার ভবন নিমার্ণের সূচনা। প্রথমে টিনসেড স্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালে। বিল্ডিং নির্মিত হয় ১৯৬৮ সালে, বর্তমানে এটি পাঁচতলা।
২। দারে উমর রাযি. : এটি উত্তর—পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত। টিনসেড স্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালে। পাকাভবন তৈরি হয় ১৯৮৭ সালে। বর্তমানে এটি পাঁচ তলা ভবন।
৩। দারে উসমান রাযি. : এটি মাদরাসার দক্ষিণ—পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। টিনসেড স্থাপিত হয় ১৯৫৬ সালে। পাকাভবন তৈরি করা হয় ১৯৯৯ সালে। বর্তমানে এটি ছয় তলা ভবন।
৪। দারে আলী রাযি. : এটি জামিয়ার দক্ষিণ দিকের প্রথম বিল্ডিং। টিনসেড নির্মিত হয় ১৯৫৭ সালে। ১৯৯৯ সালে পাকাভবন নির্মিত হয়। বর্তমানে এটি ছয়তলা ভবন।
৫। দারে হামযা রাযি. : এটি জামিয়ার দক্ষিণ দিকের দ্বিতীয় বিল্ডিং। ১৯৯৯ সালে এটি নির্মিত হয়। বর্তমানে এটি ছয় তলা ভবন।
৬। দারে যুবায়ের রাযি. : এটি মাঠের পূর্বদিকে অবস্থিত। ১৯৬৭ সালে টিনসেড স্থাপিত হয়। বর্তমানে এটি ১০ তলা ভবনের সপ্তম তলা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।
৭। দারে তালহা রাযি. : এটি জামিয়ার সম্মুখের সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত। ১৯৫৮ সালে প্রাথমিকভাবে টিনসেড নির্মিত হয়। ১৯৯১ সালে পাকা ভবন স্থাপিত হয়। বর্তমানে এটি পাঁচ তলা ভবন।
৮। দারে আবু হুরায়রা রাযি. : এটি জামিয়ার দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে দারে উসমানের পেছনে অবস্থিত। ২০১০ সালে নির্মাণ কাজ শুরু, বর্তমানে ছয় তলা ভবন।

মসজিদে বেলাল রাযি. :

১৯৫৭ সালে মসজিদ নিমার্ণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জায়গা ও আর্থিক জটিলতায় নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়। ১৯৬১ সালে দ্বিতলবিশিষ্ট পাকা মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৬৬ সালে প্রথম তলা, ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় তলার কাজ সম্পন্ন হয়। মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার মসজিদ অপ্রতুল হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলার দরবারে বহু ফরিয়াদ, অশ্রম্নর নজরানা পেশ ও অক্লান্ত শ্রম, চেষ্টা ও তদবীরের পরে ২০০৮ সালে মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বের বেদখল জমি উদ্ধার হয়। সে বছরেই বারো হাজার বর্গ ফুটের বহুতলবিশিষ্ট নতুন মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়। বর্তমানে এর ষষ্ঠ তলা নির্মাণাধীন।

জামিয়ার মুখপত্র মাসিক নেয়ামত :

মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ১৯৩৭ সালে মাসিক নেয়ামত প্রতিষ্ঠা করেন। এটা বাংলা ভাষার সর্বপ্রাচীন জীবন্ত ধর্মীয় মাসিক। পত্রিকাটি মূলত তাঁর শায়খ ও মুর্শিদ হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর রচনা ও বয়ান বাংলাভাষাভাষীদের কাছে পেঁৗছানোর জন্যই প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মাসিক নেয়ামত সম্মুখীন হয়েছে নানান প্রতিকূলতার। ১৯৯১ সালে সর্বশেষ প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি। দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর পর ফরিদাবাদ মাদরাসা কতৃর্পক্ষ পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জুন ২০১৩ থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, যা ইতোমধ্যে সচেতন লেখক ও পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।