প্রতিষ্ঠাতা
আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.
[প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম মুতাওয়াল্লী]

যুগে যুগে ওলীয়ে কামেল, নায়েবে নবীদের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁরা ইসলাম ও মুসলমানদের মাঝে সৃষ্ট সকল খোদাদ্রোহী কার্যকলাপ, আচার—অনুষ্ঠান এবং কুসংস্কারের সফল মোকাবেলা করেছেন। সাথে সাথে ইসলামের সঠিক সুন্দর চির—শাশ্বতরূপ প্রতিষ্ঠা করতে আমরণ সংগ্রাম করছেন। শত চেষ্টা করেও কুচক্রী দল তাঁদের এই মিশনের গতিরোধ করতে পারেনি। তাঁদের স্পর্শে সমাজ পরিমার্জিত হয়ে উজ্জ্বল সোনায় পরিণত হয়েছে। এ সকল মর্দে মুমিন ওলীয়ে কামেলদের একজন হলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সূর্য, রেনেসাঁ আন্দোলনের অগ্রদূত, সমাজ—সংস্কারক মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব হুজুর) রহ.।
হকের সূর্যোদয় : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু সময়টা ছিল মুসলিম জাহান তথা গোটা বিশ্বের জন্য চরম বিপর্যয়ের। ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যএশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়া ও ভারতসহ সর্বত্র চলে মুসলমানদেরকে নিঃশেষ করার প্রতিযোগিতা। এমনই নাজুক সময়ে মুন্সি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাহেবের ঔরসে আমীনা খাতুনের কোলজুড়ে মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ফরিদপুর জেলার ঘোপের ডাঙ্গা গ্রামে ১৮৯৮ খ্রি. শুক্রবার সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশবকাল : শৈশবেই তিনি গম্ভীর স্বভাবের ছিলেন। তাঁর মধ্যে ন¤্রতা, ভদ্রতা, বিনয়, চিন্তাশীলতা ও লাজুকতার মতো মহৎগুণের সমাবেশ ঘটেছিল। বেশি কথা বলতেন না। একাকী বসে কী যেন ভাবতেন। কথা বললে বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক মনে হতো। অন্য দশজন শিশু থেকে ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। সাথীদের সঙ্গে ঝগড়া করতেন না। তিনি অন্যদের ঝগড়া মিটিয়ে দিতেন।
শিক্ষা জীবন : সে সময় এ দেশে আদর্শ শিক্ষার ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর পিতা ছেলের প্রাথমিক শিক্ষা পাটগাতির এক হিন্দু পণ্ডিতের নিকট শুরু করতে বাধ্য হন। অল্প দিনের মধ্যে তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রাইমারী শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ছোটবেলা থেকেই হযরত সদর সাহেব রহ. অত্যন্ত মেধাবী ও তীক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। আরবী শেখার প্রতি ছিল প্রবল ঝেঁাক। তাই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় পেলেই আরবী শেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন। তাঁর এই আগ্রহ বাস্তবায়ন করার জন্য একদিন কলকাতা ছুটে যান। কিন্তু তাঁর পিতা ছেলের জন্য আরবী শিক্ষা পছন্দ করতেন না। তাই গোপনে স্কুল—কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আরবী পড়তে থাকেন। ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের কারণে সকল স্কুল, কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি এ সময়টাকে আরবী শিক্ষার বিরাট সুযোগ মনে করে দেওবন্দ চলে যান। হযরত থানভী রহ.—এর পরামর্শে প্রথমে সাহারানপুর মাদরাসায় চার বছর প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করেন। অতঃপর উচ্চশিক্ষার জন্য দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিন/চার বছর পড়াশোনা করেন।
হযরত থানভী রহ.—এর সোহবত : সাহারানপুর ও দেওবন্দ অধ্যয়নকালে তিনি আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রতি বৃহস্পতিবার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে থানাভবনে গমন করতেন। সেখানে জাহেরী ইলমের সঙ্গে সঙ্গে বাতেনী ইলমও শিক্ষা লাভ করতে থাকেন। অবশেষে উভয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ কামেল মানুষ হয়ে ১৯২৮ সালে দেশে ফিরে আসেন।

কর্মজীবন : দেশে ফিরে সদর সাহেব রহ. হযরত মাদানী রহ.—এর নির্দেশে জামিয়া ইউনুছিয়ার প্রধান মুহাদ্দিস ও পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময় তাঁর সহকর্মী ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল রহ., পীরজী হুজুর রহ. ও হাফেজ্জী হুজুর রহ.। তাঁর ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা। সে লক্ষ্যে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে বড় কাটারা, লালবাগ, গওহরডাঙ্গা ও ফরিদাবাদ মাদরাসা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক জীবন : মুজাহিদে আযম সদর সাহেব রহ. মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, দরস ও তাদরীসের পাশাপাশি আদর্শ রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় ছিলেন। সর্বপ্রথম ১৯২০ সালে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে শরীক হন। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান মুসলিম লীগের পালার্মেন্টারী বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে সমর্থন জানান।
সংগ্রামী জীবন : সদর সাহেব রহ. ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি। বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ১৯৫৫ সালে আতাউর রহমান কর্তৃক ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ভিত্তিতে শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে সদর সাহেব রহ.—ই সর্বপ্রথম তার বাড়ির সামনে জনসভা করে প্রতিবাদ জানান। আইউব খান যখন কোরআনবিরোধী পারিবারিক আইন করে নাস্তিক ড. ফজলুর রহমানের মাধ্যমে নতুন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়, তখন ফরিদপুরী রহ. দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মার্শাল ব্রেক করে ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান। তিনি সত্যের পথে এমনই অটল ছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট হাউজে আইউব খানকে ধেঁাকাবাজ বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। আইউব খান এহেন উক্তির প্রতিবাদে বজ্রকণ্ঠে বলল, ‘আপনি কার সামনে কথা বলছেন খবর আছে? আমি পাঠানের বাচ্চা পাঠান।’ পাল্টা জবাবে মুজাহিদে আযম রহ. আরও তেজদ্বীপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আপনার খবর আছে? আমি মুসলমানের বাচ্চা মুসলমান।’
রচনাবলি : সমগ্র জাতির মধ্যে ঈমানী চেতনা, ইসলামী তাহজীব ও তামাদ্দুন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু দীনি বই রচনা ও অনুবাদ করেন। রচিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. বায়আতনামা ২. তওবানামা ৩. ইলমের ফযীলত ৪. নামাযের ফযীলত ৫. জিকিরের ফযীলত ৬. তেজারতের ফযীলত ইত্যাদি।
ইন্তেকাল : ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রোজ মঙ্গলবার ২.৩০ মিনিটে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম চিন্তাবিদ মুজাহিদে আযম, সদরুল ওলামা হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. অগণিত শিষ্য ও ভক্তবৃন্দকে শোক—সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।