মুতাওয়াল্লী

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হেদায়াতুল্লাহ রহ.
[দ্বিতীয় মুতাওয়াল্লী]

যাকে নিষ্প্রয়োজনীয় কথা কেউ কোনোদিন বলতে শোনেনি, গোনাহের ছোঁয়া  তো অনেক দূরে, যার কল্পনাও হয়তো তিনি কোনোদিন করেননি, তীব্র রাগের মুহূর্তেও তাঁর মুখ থেকে কোনো উচ্চ আওয়াজ বেরোয়নি, নীরব সাধনা ও অধ্যাবসায়ে কেটেছে যাঁর পূর্ণ জীবন, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. যাঁকে দান করেছেন ইলমে হাদীসের শিক্ষা, হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. যাঁকে ধন্য করেছেন আধ্যাত্মিক দীক্ষায়, মুজাহিদে আযম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. যাঁকে শিষ্য বলে গর্ববোধ করতেন, যাঁর জীবন ছিল নিষ্কলুষ, ইলমে দীনের যিনি একনিষ্ঠ খাদেম, তিনি হলেনÑ বিগত শতাব্দীর মহান শিক্ষানুরাগী হযরতুল আল্লাম মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ রহ.।
জন্ম ও শিক্ষা : হযরতের প্রকৃত নাম হেদায়াতুল্লাহ। পিতার নাম মুবারকুল্লাহ। মায়ের নাম হাসনা বানু। মরহুম তাঁর প্রকৃত নামের চাইতে ‘মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর’ নামেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর ঊর্ধ্বতন শিষ্যগণের বক্তব্য মতে আনুমানিক ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে চাঁদপুর জেলাধীন শাহতলীর পার্শ্ববর্তী মুমিনপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
নিজ এলাকাতেই তাঁর শিক্ষার সূচনা। প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে বি. বাড়িয়ার জামিয়া ইউনুছিয়ায় ভর্তি হন। মেশকাত পর্যন্ত দেশে পড়াশোনা করে বাকি শিক্ষা সমাপন ও উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। দীর্ঘ ছয় বছর সেখানে অবস্থান করে উচ্চতর জাহেরী ও বাতেনী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তা প্রসারের মহান ব্রত নিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। জাহেরী শিক্ষা বা ইলমে দীন সমাপ্ত করে দীর্ঘ এক বছর হযরত থানভী রহ.—এর দরবারে থেকে আধ্যাত্মিক দীক্ষালাভে ধন্য হন। ইলমে দীন অর্জনের জন্য দারুল উলূম দেওবন্দ আর আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে থানাভবন ছাড়া আর কোথাও ভ্রমণ করেননি।

কর্মজীবন : দেশে ফিরে এসেই মরহুম ইলমে দীন প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে ঢাকাস্থ বড়কাটারা মাদরাসায় ১২/১৪ বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে লালবাগ মাদরাসায় নিয়োগ পেলে সেখানে দীর্ঘ ৩৪ বছর শিক্ষকতা করেন। এ প্রতিষ্ঠানে মুহাতামিম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জীবন সায়াহ্নের দিনগুলো যাত্রাবাড়ীস্থ জামিয়া ইসলামিয়ায় কাটান। ১৯৬৯Ñ১৯৯৫ পর্যন্ত ফরিদাবাদ মাদরাসায় নিষ্ঠার সঙ্গে মুতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করেন।
হাদীসের দরসদানে তিনি ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অসাধারণ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে তা পরিচালনা করতেন। বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফ অধ্যাপনায় তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের সাক্ষী সে কালের অগণিত শাগরিদ। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয় পাঠদানেও ছিলেন সিদ্ধহস্তÍ। লালবাগের জীবনে একবার শরহে জামী দরস দিচ্ছিলেন। তখনকার মুহতামিম সদর সাহেব রহ. ও মুফতী আব্দুল মুঈয রহ. আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁর দরস শুনে মন্তব্য করেন, ‘মোল্লা জামী রহ. জীবিত থাকলে এভাবেই শরহে জামী পড়াতেন যেভাবে মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ পড়াচ্ছেন। এ ছাড়া সদর সাহেব রহ. তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘লালবাগ জামিয়ার দুটি কুতুবখানা। একটি যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ, আরেকটি হচ্ছে জিন্দা কুতুবখানা মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ।’
হযরত মুহাদ্দিস সাহেব রহ. এর জীবন ছিল অনাড়ম্বর। অপ্রয়োজনীয় কথা তাঁর পক্ষে যেন অসম্ভব ছিল। পান—সুপারি ছিল তাঁর প্রিয়। প্রয়োজনীয় আসবাব—পত্র নিজেই বাজার থেকে কিনে আনতেন। কখনো গভীর রাতে নিজের জামা—কাপড় ধৌত করতেন, অথচ তিনি ছিলেন লালবাগের মুহতামিম।

মৃত্যু : দীনের এ মহান সিপাহসালার ২৬ মার্চ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে এ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন।

শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আযীয রহ.

[তৃতীয় মুতাওয়াল্লী]

কালের বিবর্তনে এশিয়ার বিখ্যাত মুসলিম জনপদ বৃহত্তর বঙ্গরাজ্য যখন ভ্রষ্টতার তিমিরে নিমজ্জিত, ধমীর্য় রীতি—নীতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি যখন অসহায়ত্বের শিকার, শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার যখন বয়ে এনেছিল সমাজে অমার্জনীয় পাপাচার, দিকে দিকে যখন মাজারপূজা ও ¯্রষ্টার পরিবর্তে সৃষ্টির পূজার মতো কার্যকলাপে ছেয়ে গিয়েছিল পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত, দীনি শিক্ষার প্রতি মানুষের চরম বৈরীভাব, কালের এ প্রতিকূল মুহূর্তে সমাজের সর্বস্তর থেকে গোমরাহির মূলোৎপাটন করতে পবিত্র কোরআন—সুন্নাহ এবং ইসলামী জ্ঞান—বিজ্ঞানের সঠিক আলো বিকিরণের মহান লক্ষ্যে পৃথিবীতে পদাপর্ণ করেন বিংশ শতাব্দীর অদ্বিতীয় চিন্তানায়ক ইলমের আকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, নীরব আধ্যাত্মিক সাধক শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আযীয রহ.।
জন্ম : বিংশ শতাব্দীর এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার ধর্মপুর ইউনিয়নের কদম মুন্সির বাড়িতে ১৯১৩ সালে এক বিদ্বান পিতার ঔরসে ও বিদুষী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শেখ নজর আলী, মাতার নাম জামিলা খাতুন।
বাল্যকাল ও প্রাথমিক শিক্ষা : তিনি ১৯১৯ সালে ছয় বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। অতঃপর হাটহাজারী মাদরাসায় মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এখানে হেদায়া পড়ার পর দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। সেখানে কৃতিত্বের সাথে মেধা তালিকায় স্থান লাভ করেন। বিরল প্রতিভার অত্যন্ত মেধাবী ও তীক্ষè ধীসম্পন্ন এই মনীষীকে দেওবন্দ থেকে প্রদত্ত সনদে উম্মতে মুহাম্মদীর এক অন্যতম মেধাবী সন্তান বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল ইলমে হাদীস।
কর্মজীবন : তাঁর চিন্তা ছিল এমন কিছু মানুষ তৈরি করা, যারা ইলমে ওহীর জ্ঞানে হবে সদা তৎপর। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম উম্মাহর এই অদ্বিতীয় চিন্তানায়ক উম্মতে মুহাম্মদীর সার্বিক কল্যাণ, স্বতন্ত্র মযার্দা ও স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত ১৯৪০ সালে বামার্র আকিয়াবে অতঃপর রাউজান, এরপর নাজিরহাট বড় মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৮ সালে হাটহাজারীতে নিয়োগ পান। ১৯৮১ সালে সেখানকার শায়খুল হাদীস পদে ভূষিত হন। এ ছাড়াও তিনি আরও বহু মাদরাসায় সদারতের দায়িত্ব পালন করেন।
আধ্যাত্মিকতা : দীনের সত্যবাদী এই সিদ্ধপুরুষ আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও ছিলেন মুর্শিদে মুকাম্মাল অবিসংবাদিত আধ্যাত্মিক রাহবার ও খওফে এলাহীর এক প্রকম্পিত বান্দা। ছাত্রজীবনে তিনি মাওলানা শাহ জমিরুদ্দীন রহ.—এর হাতে, দেওবন্দ থাকাকালীন মাদানী রহ.—এর নিকট, হাটহাজারীতে এসে তাসাওউফ জগতের অমর পুরুষ থানভী রহ.—এর যোগ্য খলীফা মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব রহ.—এর নিকট বায়আত হন।
রাজনীতি : তিনি স্বক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িত না থাকলেও স্বীয় উস্তাদ মাদানী রহ.—এর সংগ্রামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অশুভ তৎপরতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। বয়োবৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শিয়া, কাদিয়ানী, মওদুদী ও মাজারপূজারীদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করে গেছেন। মৃত্যুবরণ করেও দীনের এ বলিষ্ঠ পুরুষ আমাদের জন্য রেখে গেছেন শিরক—বিদআত ও কুসংস্কারের কাছে মাথা নত না করার মহান শিক্ষা।
মৃত্যু : ইতিহাসের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ চিরাচরিত নিয়মে, সৃষ্টিকতার্র অমোঘ নীতি অনুসারে ১৫ এপ্রিল ২০০০ সালে চার ছেলে সাত মেয়েসহ বহু ভক্ত অনুরুক্তদের শোকসাগরে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি জমান।

শায়খুল ইসলাম হযরতুল আল্লাম
শাহ আহমদ শফী দা. বা.
[চতুর্থ মুতাওয়াল্লী]

যে সকল অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে বুকে লালন করে আমাদের বাংলাদেশ ধন্য হয়েছে তাঁদের অন্যতম হলেন শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.—এর বিশিষ্ট খলীফা হযরতুল আল্লাম শাহ আহমদ শফী দা.বা.। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন ও বার্ধক্যের বর্ণাঢ্য জীবনসফরে একজন সফল পুরুষ, ইলম আমল, তালীম, তারবিয়াত, তাযকিয়া, তাসাওফ, দাওয়াত—সিয়াসতসহ সব অঙ্গনে যাঁর অবদান অসামান্য। ওলামায়ে কেরামের যিনি শিরোমণি, জনগণের অন্তরের মণিকোঠায় যার স্থান তিনিই আল্লামা শাহ আহমদ শফী।
১৩৫১ হিজরী মোতাবেক ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত রাঙ্গুনিয়া থানার শিলক গ্রামের সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী দীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হযরতের পিতার নাম, বরকত আলী। মাতার নাম, মুসাম্মাত মেহেরুন্নেছা বেগম।

শিক্ষাজীবন :
শৈশবে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁর বাবা তাঁকে মৌলভী আজিজুর রহমান রহ.—এর নিকট প্রেরণ করেন। সাথে সাথে প্রাথমিক শিক্ষাও সমাপ্ত হয়। এরপর সরফভাটা মাদরাসায় ভর্তি হন।
প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন বলে অল্প সময়েই কোরআনে কারীমের তেলাওয়াতসহ প্রাথমিক শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করেন। এরপর এই প্রতিভাবান বালক দীনি ইলম অর্জনের অদম্য স্পৃহা নিয়ে ছুটে যান ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল—জামিয়াতুল আরাবিয়া আল—ইসলামিয়া জিরি মাদরাসায়। সেখানে ছয় মাস অধ্যয়নের পর বৃটিশ—জামার্নির রণদামামা বেজে ওঠে। তখন হাফেজ ইমতিয়াজ সাহেবের সহায়তায় দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে ভর্তি হন। তখন বয়স মাত্র দশ বছর। ১৩৬১ হিজরীতে তার মা—বাবা চিরদিনের জন্য তাকে এতীম করে মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দেন।
হাটহাজারী মাদরাসায় দীর্ঘ দশ বছর একাগ্রতার সাথে দীনি ইলম অর্জন করেন। যুগশ্রেষ্ঠ আসাতিযায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে এ সময় বাংলা, উর্দু, ফার্সি, আরবী ভাষা ও সাহিত্যসহ ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, মান্তেক, ফালসাফা, বালাগাত শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।
হাটহাজারী মাদরাসায় তিনি যে সকল আসাতিয়ায়ে কেরামের পাঠ গ্রহণে ধন্য হন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, মুফতীয়ে আযম হযরত মাওলানা ফয়জুল্লাহ রহ., শাইখুল হাদীস আল্লামা সুফী আব্দুল কাইয়ূম রহ., শাইখুল আদব আল্লামা মুহাম্মদ আলী নিযামপুরী রহ., শায়খ আল্লামা আবুল হাসান রহ.।

উচ্চতর শিক্ষা :
১৩৭১ হিজরীতে তিনি ছুটে যান উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী দারুল উলূম দেওবন্দ। সেখানে দাওরায়ে হাদীস, দাওরায়ে তাফসীর ও ফুনুনাতে আলিয়া বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।
দারুল উলূম দেওবন্দে তিনি যে সকল মনীষীর সং¯্রবলাভে ধন্য হন তাঁরা হলেন, ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের অগ্রসেনানী হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.। দেওবন্দ অবস্থানকালেই তিনি এ মনীষীর হাতে বাইয়াত হন এবং খেলাফত লাভ করেন। হযরত মাদানী রহ.—এর কাছে তিনি বুখারী শরীফের দরস গ্রহণ করেন। এ ছাড়া শাইখুল আদব হযরত আল্লামা এজায আলী সাহেব রহ.—এর কাছে তিনি তিরমিযী ও আবু দাউদ শরীফের দরস গ্রহণ করেন। মুসলিম শরীফ এবং ফুনূনাতে আলিয়ার দরস নেন হযরত মাওলানা ইবরাহীম বালিয়াভী রহ. থেকে। তহাবি, মুয়াত্তা মুহাম্মদ ও মুয়াত্তা মালেকের দরস গ্রহণ করেন যথাক্রমে মাওলানা মুবারক রহ., মাওলানা জহিরুল হাসান রহ. ও মাওলানা জলিল আহমদ রহ. থেকে। অপরাপর আসাতিযায়ে কেরাম থেকে অন্য কিতাবাদির দরস নেন।

কর্মজীবন :
শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর তিনি তাঁর পরম শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ দারুল উলূম মঈনুল ইসলামের তৎকালীন মুহতামিম আল্লামা আব্দুল ওয়াহহাব রহ.—এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাঁর প্রখর মেধা, সততা, উদারতা, আত্মত্যাগ, ইখলাস, আমল—আখলাক, যোগ্যতা ও দায়িত্ব সচেতনতা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন। তিনি তাকে হাটহাজারী মাদরাসায় শিক্ষক পদে নিয়োগ দেন। এখান থেকেই এই মনীষীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা।
হিজরী বর্ষপঞ্জিতে তখন ১৪০৭। দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর তৎকালীন পরিচালক হাফেজ কারী আল্লামা হামেদ সাহেব ইন্তেকাল করেন। তখন জামিয়ার মজলিসে শূরার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে জামিয়া পরিচালনার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপর। তাঁর পরিচালনায় অদ্যাবধি জামিয়া সুচারুরূপে পরিচালিত হয়ে আসছে।
১৯৯৫ সালে জামিয়ার শতবর্ষপূর্তি হয়। এ উপলক্ষে বিশাল দস্তারবন্দী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে দেশ—বিদেশের বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে জামিয়ার দশ সহ¯্রাধিক ফুজালাকে দস্তারে ফজিলত প্রদান করা হয়। জামিয়ার দাওরায়ে হাদীসের ছাত্রসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় শতবার্ষিকী মহাসম্মেলনের পর থেকে বর্তমানে প্রতি বছর বার্ষিক মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তা ছাড়া হযরতের ইলমী অনুরাগ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে জামিয়ার শিক্ষা বিভাগে উচ্চতর কিরাত ও তাজবিদ বিভাগ, উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগ, দারুল মুতালাআ, মাসিক মঈনুল ইসলাম—এর নিয়মিত প্রকাশনা, মজলিসে ফিকহিল ইসলামী, সাপ্তাহিক মজলিস ও ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূমের প্রকাশ চলমান রয়েছে।
ইলমের সুবিস্তীর্ণ খেদমতের পাশাপাশি হযরত সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সদাসচেতন। দেশ ও দেশবাসীর মাঝে ধমীর্য় মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে তাঁর অবদান অপরিসীম।
বর্তমানে তিনি সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। ইসলাম ও মুসলমানদের যেকোনো ধরনের সমস্যায় এগিয়ে আসতে তিনি কুণ্ঠিত হন না। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি হেফাজতে ইসলাম গঠন করেন। যখন বেয়াদব নাস্তিকরা নানাভাবে মহান আল্লাহ, নবী ও ইসলামধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করে যাচ্ছিল তখন হেফাজতে ইসলাম দৃঢ়ভাবে এসব বেয়াদবদের মোকাবেলা করে। ইসলামী নেতৃবৃন্দকে তিনি সু—পরামর্শসহ নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছেন বহুপূর্ব থেকেই।
তাঁর খেদমত শুধু দেশে নয় বরং বিদেশেও ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, দুবাই, আরব আমিরাত, সৌদিআরবসহ বিশ্বে তাঁর ছাত্রসংখ্যা লক্ষাধিক। তাঁর পাণ্ডিত্য ও বিনয়ে মুগ্ধ হয়ে হারামাইন শারীফাইনের ইমামগণ তাঁকে শায়খ বলে সম্বোধন করে থাকেন। ২০০৫ সালে জাতীয় সিরাত কমিটি কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ইসলামী ব্যক্তিত্ব উপাধিতে ভূষিত হন।
আধ্যাত্মিকতা :
আমাদের পূর্বসূরিদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার উভয় গুণেরই সমাবেশ ঘটিয়েছেন। আর মাকবূলিয়্যাত অর্জনের পূর্বশর্ত হলো মাকবূল ব্যক্তির সাহচর্য গ্রহণ করা। কারণ, ‘সঙ্গ গুণে রঙ্গ ধরে।’ হযরত মাওলানা শাহ আহমদ শফীও এমনই এক ব্যক্তিত্ব যাঁর মধ্যে পূর্বোক্ত উভয়গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.—এর সোহবতপ্রাপ্ত এই আধ্যাত্মিক ব্যক্তি নিজ কর্মময় জীবনের হাজারো ব্যস্ততা সত্ত্বেও গড়ে তুলেছেন সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক জগৎ। যে জগতে তাঁর সাথে রয়েছে তাঁরই সুযোগ্য পাঁচ শতাধিক খোলাফায়ে কেরাম ও অসংখ্য মুরিদ—ভক্ত ও অনুরক্তবৃন্দ।
রচনাবলি :
সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থসহ হাদীস, তাফসীর, আকাইদ, তাসাওফ, তাবলীগ ও সমাজ সংশোধন বিষয়ক বহু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন, যা পাঠক ও বিশেষজ্ঞ মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর রচনাবলির শীর্ষস্থানে রয়েছে :
উদুর্ : ১। আল—বায়ানুল ফাসিল বাইনাল হক্কে ওয়াল বাতিল ২। আল—হুজাজুল কাতিয়াহ লিদাফয়িন নাহজিল খাতেয়াহ ৩। আল—খাইরুল কাসির ফি উসূলিত তাফসীর ৪। ইসলাম ওয়া ছিয়াছাত ৫। ইজহারে হাকীকত ৬। তাকফীরে মুসলিম ৭। চান্দ রাওয়েজা ৮। ফয়ূজাতে আহমদিয়া ৯। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফয়জুল বারী এবং মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইত্যাদি।
বাংলা : ১। হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব ২। ইসলামী অর্থব্যবস্থা ৩। ইসলাম ও রাজনীতি ৪। ইজহারে হাকীকত বা বাস্তব দৃষ্টিতে মওদূদী মতবাদ ৫। তাকফীরে মুসলিম বা মুসলমানকে কাফের বলার পরিণাম ৬। সত্যের দিকে করুণ আহবান ৭। ধূমপান কি আশীর্বাদ না অভিশাপ ৮। একটি সন্দেহের অবসান ৯। একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া ১০। তাবলীগ একটি অন্যতম জিহাদ ১১। ইসমতে আম্বিয়া ও মিয়ারে হক ১২। বায়আতের হাকীকত। এ ছাড়াও উদুর্ এবং বাংলা ভাষায় হযরতের আরও অনেক মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইলম, আমল ও আধ্যাত্মিকতার প্রাণপুরুষ নববী আদর্শের প্রতিচ্ছবি, বিদগ্ধ আলেমে দীন, যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে পেয়ে গোটা জাতি আজ গর্বিত। মানবতা ও নীতি নৈতিকতা অবক্ষয়ের এ যুগে নববী আদর্শে উজ্জীবিত এ সাহসী পুরষের কাছে জাতি চিরঋণী। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় ও দোদুল্যমান অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরাম তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা তাঁর বরকতময় ও সুদীর্ঘ জীবন কামনা করি।