মুহতামিম

হযরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. [প্রথম মুহতামিম]

জন্ম ও বংশ : তিনি ১৩১৪ হিজরীতে নোয়াখালী জেলার রায়পুর থানার অন্তর্গত লুধুয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুন্সি ইদরীস। দাদা মাওলানা আকরাম উদ্দিন মিয়াজি। হযরতের দাদা ছিলেন বালাকোটের শহীদ হযরত মাওলানা সাইয়িদ আহমদ বেরলভি রহ.—এর অন্যতম খলীফা বীর মুজাহিদ মাওলানা ইমামুদ্দীন রহ.—এর খলীফা।

শৈশবকাল ও প্রাথমিক শিক্ষা : ধার্মিক পরিবারে জন্মলাভ করায় শৈশবকাল থেকে ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন। ক্রীড়া—কৌতুকে যোগ দিয়ে সময় অপচয় করতেন না। সর্বদা নিজ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। প্রথমে চাচা মৌলভী ইউনুস সাহেবের নিকট কালামে পাকের সবক গ্রহণ করেন। সঙ্গে প্রাথমিক উর্দু ও ফারসি অধ্যয়ন করেন।
এরপর গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষকের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর ফরিদপুর জেলার দুলাইর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দুই বছরের কোর্স এক বছরে সমাপ্ত করে প্রাইমারি পাশ করেন। এরপর তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন।
মাদরাসা শিক্ষা : সে সময় নোয়াখালী জেলার লক্ষ্মীপুর থানার চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজারে একটি প্রসিদ্ধ ধমীর্য় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর হযরতের পিতা তাঁকে এ মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। এখানে প্রাথমিক কিতাবাদি ও গুলিস্তঁা পড়েন। এক বছর পর কুমিল্লা জেলার লাকসামস্থ নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরীর প্রসিদ্ধ মাদরাসায় ভর্তি হয়ে এক বছর পড়াশোনা করে ফারসি, মিযান, মুনশাইব ইত্যাদি কিতাবাদি সমাপ্ত করেন।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য পানিপথ যাত্রা : লাকসাম মাদরাসায় পড়াশোনার পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৩৩০ হিজরীতে দেড় টাকা সম্বল নিয়ে পানিপথের উদ্দেশে রওয়ানা করেন। নিজ গ্রাম লুধুুয়া থেকে ২০/২২ মাইল পায়ে হেঁটে চাঁদপুর এসে উপস্থিত হন। সেখান থেকে স্ট্রিমারযোগে বরিশাল হয়ে খুলনা পেঁৗছেন। এরপর পায়ে হেঁটে ৪০ মাইল অতিক্রম করে যশোর হয়ে কোলকাতা অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে তাঁকে কুকুর কামড়ালে উত্তর ভারতের কাসুরি পাহাড়ের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। ডাক্তারের পরাপর্শে ডিসিকে নিজের বিস্তারিত অবস্থা খুলে বললে তিনি সরকারি খরচে পানিপথে পাঠিয়ে দেন। সেখানে কারী আবদুস সালাম সাহেবের নিকট পড়াশোনা করতে থাকেন। ১৩ পারা হিফয বাকি থাকতেই কারী সাহেব মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। এমন সময় তিনি হাফেজ কারী আখলাক হুসাইন সাহেবের নিকট হিফয সমাপ্ত করেন।

সাহারানপুর ও দেওবন্দ গমন : ১৩৩৩ হিজরীতে পানিপথ থেকে এসে থানভী রহ.—এর পরামর্শে মাযাহিরুল উলূমে ভর্তি হন। সাত বছর দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর ১৩৪০ হিজরীতে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন।
১৩৪১ হিজরীতে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনের লক্ষ্যে দারুল উলূম গমন করেন। বিশেষ করে মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ.—এর দরসে হাদীসের বরকত লাভে ধন্য হওয়ার অন্যতম বাসনা ছিল। দুঃখের বিষয়, সে বছর কোনো কারণে কাশ্মিরি রহ. দেওবন্দ ছেড়ে ডাভেলে চলে যান। তখন শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. শায়খুল হাদীস পদে নিযুক্ত হন। তাঁর কাছে নিয়মিত কোনো কিতাব অধ্যয়ন করেননি। তবে মাঝেমধ্যে দরসে বসতেন। নিয়মিত পড়েছেন মাওলানা রাসুল খান রহ., মাওলানা বদরে আলম মিরাঠি রহ., শায়খুল আদব এযায আলী রহ. প্রমুখের নিকট।

আধ্যাত্মিক সাধনা : হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.—এর বাতেনী ফয়েজ লাভে আত্মনিয়োগ করেন। প্রায় ছয় মাস সাধনায় নিমগ্ন থেকে তিনি সুলূকের সবোর্চ্চ স্তর লাভে ধন্য হন। বড়কাটারা মাদরাসায় শিক্ষকতাকালে জীবনের প্রথম হজ সফর শেষে বাড়িতে ফিরে এলে পত্রের মাধ্যমে তাঁকে বায়আত ও তালকীনের ইজাযত দেন।

কর্মজীবন : সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুছিয়ায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। পাঁচ বছর পর বাগেরহাট জেলার গজালিয়া গ্রামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর এক বছর পর ১৩৪৮ হিজরীতে ঢাকার বড় কাটারা এসে দীর্ঘ ২৩ বছর শিক্ষকতা করেন। ১৩৭০ হিজরীতে জামিয়া লালবাগ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন এবং সেখানে শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৩৮৪ হিজরীতে মাদরাসায়ে নূরিয়া প্রতিষ্ঠা ও তাতে পাঠদানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সুদীর্ঘ ষাট বছরের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি পাঠদান করেন।

আন্তজার্তিক ভূমিকা : তিনি মুসলিম উম্মাহর বিবাদ নিরসনে যথেষ্ট অবদান রাখেন। ইরাক—ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তা ছাড়া লন্ডনে আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করে মুসলিম বিশ্বের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সহায়ক প্রস্তাবাদি পেশ করেন।

রাজনৈতিক জীবন : ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। বিপুল সাড়া জাগিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করতে সক্ষম হন। পরে সে বছর খেলাফত আন্দোলন নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৮১ সালের পর তিনিই এ ধরনের দল গঠন প্রবর্তন করেন। ইন্তেকাল অবধি খেলাফতের আমীরে শরীয়ত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে আরও ছয়টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ।

পরলোকগমন : ৮ রমযান ১৪০৭ হিজরী মোতাবেক ৭ মে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৃহস্পতিবার বিকাল পৌনে তিনটায় ৯৫ বৎসর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন। নূরিয়া মাদরাসায় নারিকেল বিথীর শ্যামল চত্বরে চির—নিদ্রায় শায়িত আছেন।

হযরত মাওলানা বজলুর রহমান রহ.
[দ্বিতীয় মুহতামিম]

জন্ম :
তিনি ১৯০৯ সালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভার দয়াপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ কারণে পরবর্তীতে তিনি দয়াপুরী হুজুর হিসেবে খ্যাত হন। তাঁর দাদা মরহুম আশরাফ আলী। পিতা মুন্সি তৈয়ব আলী ও মাতা আকলিমা খাতুন।

প্রাথমিক শিক্ষা :
পার্শ্ববর্তী গ্রাম ধর্মপুরে বরিশালের এক বিজ্ঞ আলেমের নিকট মক্তবে পড়াশোনা শুরু করেন। অতঃপর কুমিল্লা শহরের সৈয়দ বাড়িতে অবস্থিত মিল্লিয়ায় হেদায়া পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এখানে তাঁর উস্তাদ ছিলেন মাওলানা আতহার আলী রহ. এবং ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.।

উচ্চশিক্ষা :
ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দে উচ্চশিক্ষার জন্য গমন করেন। সেখানে তিনি দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। যেসব স্বনামধন্য ওলামায়ে কেরামের নিকট হাদীস পড়েন তারা হলেন :
১। শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. ২। হযরত মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানী রহ. ৩। হযরত মাওলানা রাসুল খান রহ. ৪। হযরত মাওলানা আসগর হুসাইন রহ. ৫। হযরত মাওলানা ইদরিস কান্ধলবী রহ. ৬। হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. ৭। হযরত মাওলানা ইয়াকুব রহ.
কর্মজীবন :
দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার পরপরই ১৩৫৪ হি. মোতাবেক ১৯৩৫ খ্রি. ঢাকা হুসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে ইলমে নববীর খিদমত শুরু করেন। মাঝে কয়েক বছর বাদ দিয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর তিনি সেখানে হেদায়া, জালালাইন ও তিরমিযীসহ অন্যান্য কিতাবের দরস দেন। মাঝে তিনি কুমিল্লা কাসেমুল উলূম মাদরাসায় দুই বছর শিক্ষকতা করেন। নারায়ণগঞ্জ দারুল উলূম দেওভোগ মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্বে কয়েক মাস নিয়োজিত ছিলেন। হযরত মুফতী শফী রহ.—এর নির্দেশে দুই বছর করাচি দারুল উলূমে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে আবার বড় কাটারায় ফিরে আসেন। বড় কাটারায় শিক্ষকতার দায়িত্ব ছাড়াও নাযেমে তালীমাতের দায়িত্ব পালন করেন। তখন বড় কাটারার মুহতামিম ছিলেন পীরজী হুজুর রহ.। সদরুল মুদাররিসীন ছিলেন সদর সাহেব রহ.।

এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, ধমীর্য় রাজনৈতিক অধিকার এবং ইসলামী—শিক্ষা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় মাওলানা বজলুর রহমান সাহেবের ছিল বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। রাজনৈতিক জীবনে নেযামে ইসলাম পার্টির সাথেও জড়িত ছিলেন। পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল পদের জন্য প্রস্তাব করা হলে তিনি প্রত্যাখান করেন। তখন পার্টির সেক্রেটারী ছিলেন চট্টগ্রামের খতীবে আজম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ রহ.। তখন তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নেযামে ইসলাম পার্টি ছিল যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরীক দল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও সচেতন ব্যক্তিত্ব। সামাজিক জীবনে সকলেই তাঁর চিন্তাধারাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করতেন। জটিল সমস্যার সমাধানে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা :
সে সময় শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই অপ্রতুল। তাই শিক্ষা বিস্তারে নিরলস পরিশ্রম করে যান। নিজ গ্রামে একটি কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশ—বিদেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের এই মাদরাসায় শুভাগমন হয়ে আসছে। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর নামানুসারে মাদরাসার নাম রাখেন, ‘মাদরাসা ইমদাদুল উলূম দয়াপুর’। এ মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস ও ইফতা বিভাগ পর্যন্ত আছে।

কর্মব্যস্ত জীবন :
১৯৬২ সালে মুহতামিমের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসায় আসেন। তখন মাদরাসায় মক্তব, হিফযখানা ও কিতাব বিভাগের প্রাথমিক ২/১ টি জামাত ছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় সীমিত সময়ে পর্যায়ক্রমে দাওরায়ে হাদীসে উন্নীত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় উচ্চতর ইসলামী গবেষণা পরিষদ ইদারাতুল মাআরিফ। তিনি নাজাত পত্রিকার উপদেষ্টা পদও অলঙ্কৃত করেন। উল্লেখযোগ্য শিষ্য :
১। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. ২। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব ৩। হযরত মাওলানা কুতুবুদ্দীন সাহেব ৪। হযরত মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান সাহেব ৫। মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা আবদুল গাফফার সাহেব ৬। হাফেজ মাওলানা মুহসিন সাহেব।

দাম্পত্য জীবন :
দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। কখনো মুহতারামা সহধর্মিণীর সাথে রাগতস্বরে কথা বলতেন না। আপনি বলে সম্বোধন করতেন। উৎসাহ দিয়ে সব কাজ করাতেন। সকল কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

জীবন—যাপন :
তাঁর জীবনযাত্রার মান ছিল খুবই সাধারণ। রাজনৈতিক ব্যক্তি হলেও অর্থলিপ্সার ছেঁায়া লাগেনি কোনোদিন। মাটির ঘরেই ক্ষণস্থায়ী জীবন কাটিয়েছেন। আরেকটি মাটির ঘরের টানে লক্ষ মানুষের ভালোবাসা ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ডাকে কবর জগতের বাসিন্দা হন। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ খ্রি. মোতাবেক ২৬ শাবান ১৩৯৩ হি. সোমবার ৬৪ বয়সে পরপারে পাড়ি জমান।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতে সুউচ্চ মযার্দায় অধিষ্ঠিত করুন।

হযরত মাওলানা ইসমাঈল রহ.
[তৃতীয় মুহতামিম]

জন্ম ও বংশ পরিচয় :
তিনি ১৩ বৈশাখ ১৩১৬ বাংলা সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত মুন্সি সালামাতুল্লাহ খান এবং মাতার নাম মালেকা খাতুন।

শিক্ষাজীবন :
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় মুমিনবাড়ি মক্তবে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ছাত্রজীবনের প্রথম সবক গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে কাটাখালী ও বটতলী মাদরাসায় কিছুদিন লেখাপড়া করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ছিল ইলমে দীনের প্রতি প্রবল আগ্রহ ও পিপাসা, তাই সে পিপাসা নিবারণের জন্য তিনি ছুটে গেলেন বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম হাটহাজারীতে। সেখানে হেদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত লেখা—পড়া করেন এবং উস্তাদদের নজর কাড়তে সক্ষম হন।
হেদায়াতুন্নাহু পড়া অবস্থায় পিতার নির্দেশে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিবাহ করেন। কিন্তু ইলমে দীন হাসিলের পিপাসায় এতই কাতর ছিলেন যে বিবাহের পরদিনই ইলমে দীন অর্জনের জন্য দারুল উলূম দেওবন্দের উদ্দেশে রওয়ানা হন। সেখানে একাধারে সাত বছর লেখা—পড়া করে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। সেখানে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন, দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত না করে বাড়িতে যোগাযোগ করবেন না, চিঠিপত্র খুলে দেখবেন না এবং বাড়িও ফিরবেন না। তা—ই ঘটল, যেমনটি ঘটেছে আমাদের অনেক আকাবিরের জীবনে।

কর্মজীবন :
১৩৪০ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফিরে এসেই তাঁর গ্রাম মুমিন বাড়িতে দরসে নেযামির মাদরাসা চালু করেন। উক্ত মাদরাসায় নয় বছর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ফারাক্কাবাদ ইসলামিয়া মাদরাসায় একটানা ২৪ বছর মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানাধীন সাদীপুর সিনিয়র মাদরাসায় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দুই বছর ছিলেন। অতঃপর মুন্সিগঞ্জ জেলার মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায় দুই বছর মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে একাধারে প্রায় সাত চিল্লা পরিমাণ সময় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এরপর আরমানীটোলা জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধের সময় ফরিদাবাদ মাদরাসা দুই বছর বন্ধ থাকার পর মুরুব্বীগণ পুনরায় মাদরাসা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই সময় কতৃর্র্পক্ষের অনুরোধে তিনি মুহতামিমের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। জীবনের বাকী সময় ফরিদাবাদে কাটিয়ে দেন। তাঁর পরিচালনার দীর্ঘ ১২ বছর জামিয়ার ইলমী তারাক্কি বৃদ্ধি পায়। সর্বদা ইলম ও আমলের ময়দানে যোগ্য ছাত্র তৈরির ফিকিরে মগ্ন থাকতেন। ছাত্রদের প্রতি খুব দরদি ছিলেন। তাই সব সময় ছাত্রদের খোঁজ—খবর রাখতেন। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।

আধ্যাত্মিকতা :
দেওবন্দ থাকাকালীন জাহেরী ইলমের পাশাপাশি বাতেনী ইলমের দিকেও মনোনিবেশ করেন। তাই প্রথমে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.—এর হাতে বাইআত হন। দেশে ফেরার পর শায়খের সাথে আর সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি। তাই তিনি তাঁর পীর ভাই, মাদানীর অন্যতম খলীফা ফেনুয়ার মাওলানা দেলোয়ার হুসাইন রহ.—এর নিকট রুজু হন এবং তার দিক—নির্দেশনা মোতাবেক কঠোর সাধনা করার পর খেলাফত লাভ করেন। তিনি ছিলেন বিনয়ী, নির্জনতাপ্রিয়, সাধক, অসাধারণ সংযমী, খোদাভীতি ও খোদানির্ভরতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তা উপলদ্ধি করতে পারতেন তারা যারা তাঁর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছেন, কিংবা তাঁকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি সর্বদা ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। মৃত্যুর সময়ও তাঁর জবানে জিকির জারি ছিল।

ওফাত :
অবশেষে দীনের এই নিঃস্বার্থ খাদেম, নীরব সাধক ১৯৯১ সনে পরলোক গমন করেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।

হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান রহ.
[চতুর্থ মুহতামিম]

জন্ম ও শৈশব : হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান রহ. ১৯২৭ সালে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পীরপুর গ্রামের এক ধার্মিক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মুহাম্মাদ সাআদাত আলী। মায়ের নাম আখতারুন্নেসা। দাদা মুন্সি জমিরুদ্দীন। নানা মাওলানা গিয়াস উদ্দীন।

শিক্ষাজীবন : চার বছর বয়সে ফজলুর রহমান রহ. নিজ বাড়িতে মা—বাবার নিকট ‘আলিফ বা’—এর পাঠ শুরু করেন। পিতা—মাতার কাছে ও পীরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলামের মৌলিক কিছু বিষয় শিক্ষালাভ করেন। এরপর তিনি নরসিংদী মির্জানগর হিফয খানায় ভর্তি হন। সেখান থেকে এসে শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপ শুরু করেন ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায়। এখানে তিনি দেশের খ্যাতনামা আলেম ও পীর—বুযুর্গদের সাহচর্য লাভ করেন। মিজান থেকে মেশকাত পর্যন্ত বড়কাটারা মাদরাসায় পড়েন। তারপর ইলমে হাদীসের উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের সিন্ধুর টেন্ডাল্লাইয়ার গমন করেন। ইলমে হাদীসের ওপর আরও ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য ১৯৫৩ সালে লাহোরের জামিয়া আশরাফিয়া যান। এভাবে আরও কয়েক জায়গায় হাদীসের উপর উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।

কর্মজীবন : ১৯৫৪ সালে লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফেরেন এবং ইশ্বরগঞ্জ থানার সোহাগী মাদরাসায় শিক্ষক হিসাবে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। অতঃপর বগুড়ার নদীপুর মাদরাসায় তিন বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৬১ সালে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফরিদাবাদ মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে মুহতামিম পদ অলঙ্কৃত করেন এবং সুনামের সাথে এই গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০—১৯৯৯ পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব কাঁধে তুলে দেন। ২০০১ সালে তিনি জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া মাদরাসায় নায়েবে মুহতামিম পদ অলঙ্কৃত করেন। খুব সচেতনতার সাথে তিনি সব কয়টি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাদরাসায় দরস দানের পাশাপাশি হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদও ছিলেন। তাঁর রক্তের প্রতিটি কণায় কণায় জিহাদী চেতনা বিচ্ছুরিত হতো। যুলুম—নিযার্তন থেকে জাতিকে মুক্ত করে ইসলামী পরিবেশ কায়েম করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ।

তাসাওফের পথে : তিনি সর্বপ্রথম হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.—এর খলীফা হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান কামেলপুরী রহ.—এর হাতে বায়আত হন। তাঁর ইন্তেকালের পর থানভী রহ.—এর অন্যতম খলীফা দারুল উলূম দেওবন্দের দীর্ঘদিনের সফল মুহতামিম হযরত মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তৈয়্যব রহ.—এর হাতে বায়আত হন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত মাওলানা আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.—এর কাছে নিজেকে সঁপে দেন।

ইন্তেকাল : সর্বজনমান্য এই মনীষী ১লা ফেব্রুয়ারি ২০০৪ খ্রি. রবিবার দিবাগত রাতে ৭৭ বছর বয়সে (ঈদুল আযহার রাতে) ৩.৪৫ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোহরাওয়াদীর্ হাসপাতালে ইহজগৎ ত্যাগ করে মাওলার দরবারে চলে যান। জাতীয় ঈদগাহে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। নামাযের ইমামতি করেন তাঁরই উস্তাদ বাইতুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব হযরত মাওলানা উবাইদুল হক সাহেব রহ.।
মৃত্যুকালে তিনি পাঁচ পুত্র, তিন কন্যা, স্ত্রী, ভাই এবং অনেক আত্মীয়—স্বজন রেখে যান। সারা দেশে অসংখ্য ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে উপস্থিত হন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।

শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল হাফীয রহ.
[প্রথম শায়খুল হাদীস ও পঞ্চম মুহতামিম]

জন্ম ও পরিচয় : ইলমে নববীর এ মহান সাধক ১৯২৪ সালে চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত শাহরাস্তি থানার খেড়িহর গ্রামে এক দীনি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জনাব ইয়াসিন মুন্সি ছিলেন গ্রামের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট সমাজসেবক।

শিক্ষাজীবন : শ্রদ্ধেয় পিতার কাছেই তাঁর পড়া—লেখার হাতেখড়ি। অতঃপর প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন পাশ্ববতীর্ গ্রাম ‘জাফর নগরে’ কারী ইবরাহীম সাহেবের কাছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার বদলকোট গ্রামে ইসলামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। এখানে তিনি হেদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত পড়েন। প্রখ্যাত মুফাচ্ছিরে মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিছবাহ সাহেব রহ.—এর পিতা মাওলানা আবদুল হাই রহ. ছিলেন তাঁর উস্তাদ।

উপমহাদেশের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দ যাওয়ার পথ তাঁর জন্য সুগম হলে ইলম অন্বেষা মুসাফির দেওবন্দে পাড়ি জমান। মাদরাসায় ভর্তি হয়ে শুরু করেন অবিরাম চেষ্টা এবং প্রাণান্তকর সাধনা।
দেওবন্দে আল্লামা নাসির আহমদ খান রহ.—এর কাছে কাফিয়া পড়েন। শায়খুল আরব ওয়াল আযম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.—এর নিকট বুখারী ও তিরমিযী পড়েন। মাঝে দুই বছর জালালাবাদ মাদরাসার যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ হযরত মসিহুল্লাহ খান সাহেবের বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সেখানকার শায়খুল হাদীস হযরত সলিমুল্লাহ খান সাহেবের সাথেও হযরতের নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন : তাঁর জীবন মুসলিম বিশ্বের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব মুফতী শফি ও শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.—এর স্নেহ ও মমতাপূর্ণ আস্থায় আবরিত ছিল। যে কারণে শিক্ষাজীবন পরিসমাপ্তির সাথে সাথেই তিনি শিক্ষকতায় পদার্পণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন মুফতী শফি রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া ফারূকিয়ায়। মুফতী শফি রহ. দারুল উলূম দেওবন্দে একজন যোগ্য শিক্ষক চেয়ে চিঠি পাঠালে হযরত শায়খুল আদব রহ. তাদের জন্য হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুরকে নির্বাচিত করেন। মাওলানা এজায আলী রহ.—এর এই নির্বাচনই বলে দেয়, হযরত মুহাদ্দিস হুজুরের প্রতি তাঁর শিক্ষকগণের কত বিশ্বাস ও আস্থা ছিল।

হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর যখন পাকিস্তান ফারূকিয়ায় সিনিয়র উস্তাদ তখন মুসলিম বিশ্বের বর্তমান খ্যাতিমান গবেষক মুহাদ্দিস ও বিচারপতি মাওলানা তকি উসমানী দা. বা. নীচের দিকের ছাত্র। হযরতের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে ইলমও অর্জন করেছেন। তবে নিয়মতান্ত্রিক দরসে তাঁর ছাত্র ছিলেন না। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সফরকালে কোনো এক মজলিসে আল্লামা তকি উসমানী দা.বা.কে হযরতের ছাত্র কি না এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, হযরত তো ওপর স্তরের উস্তাদ ছিলেন, তাই তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। এতে সহজেই অনুমেয়, ফারূকিয়ার সেই স্বর্ণযুগে হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুরের কাছে যাঁরা পড়েছেন নিশ্চয় তাঁরা এখন সে দেশের শিক্ষা—সংস্কৃতি ও সাহিত্যের জগতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।

হযরত ছিলেন পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। তাই কিছুদিন পর পিতার নির্দেশে দেশে ফিরে আসেন। দেশে আসার পর আল্লামা ফরিদপুরী রহ.—এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী গওহরডাঙ্গা মাদরাসার উস্তাদ নিযুক্ত হন। আল্লামা ফরিদপুরী রহ.—এর সাথে তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। ফরিদপুরী রহ. প্রায়ই হযরতের প্রশংসা করে বলতেন, মওদুদীবাদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্নের ব্যাপারে মাওলানা আব্দুল হাফীযের দৃঢ়তা প্রশংসনীয়, যা অনেক ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছে।

১২/১৪ বছর সেখানে শায়খুল হাদীস হিসেবে দরস দানের পর কিছুদিন ‘গোবরা’ মাদরাসায় সদরুল মুদাররিসীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও তিনি বরিশালের মাহমুদিয়া মাদরাসায় কিছুদিন দরস—তাদরীসের কাজে রত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ফরিদাবাদে আগমন করেন। অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বৎসর এখানেই হাদীসের আলো ছড়িয়ে যান। তিনি ফরিদাবাদে সর্বপ্রথম বুখারীর দরস চালু করেন। তা ছাড়া মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, হেদায়া, বায়যাভীর মতো কিতাবাদিও তিনি অনুপম যোগ্যতার সাথে দরস দিয়েছেন। ১৯৯০ সালে ছয় মাসকাল জামিয়ার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। যেহেতু দরস ও তাদরীসই তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল, তাই একজন উপযুক্ত ব্যক্তির অপেক্ষায় ছিলেন। কিছুকাল পর মাওলানা আতাউর রহমান খান সাহেবকে মুহাতামিমের দায়িত্বে নিয়োজিত করে তাদরীসের কাজে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

দরসের বৈশিষ্ট্য : তাঁর দরস দানের পদ্ধতি ছিল অনন্য। অতি অল্প কথায় ও সহজ ভাষায় সারমর্ম বলে দিতেন। কঠিন বিষয় দৃষ্টান্ত দিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে, সাধারণ ছাত্রদেরও বিষয়টি সহজে বোধগম্য হয়ে যেত। কখনো প্রশ্নের উত্তর চাইতেন এক—দু শব্দে, যাতে মূল উত্তরের সাথে অতিরিক্ত বিষয়ের সংযোজন না ঘটে। এর ফলে ছাত্রদের মেধা আরও প্রখর হয়ে উঠত।

ইসলামী ফিকহ ও হাদীসের ময়দানে : প্রত্যেক বিষয়ে তিনি সমান দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন। হাদীসশাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল অনন্য ও ঈর্ষণীয়। ইলমে হাদীসকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট একদম সহজ করে দিয়েছিলেন। যেকোনো জটিল হাদীস তাঁর কাছে পেশ করা হলে তিনি এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন, মনে হতো এতে কোনো জটিলতাই নেই। প্রায় প্রতিটি হাদীসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নিজস্ব একটি অভিমত থাকত, যা অত্যন্ত পছন্দনীয় হতো। অভিমত নিছক মনগড়া হতো না বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বহু কিতাব অধ্যয়নের ফলেই হতো।
ইসলামী ফিকহ সম্পর্কেও তাঁর ধারণা বিশাল—বিস্তৃত। বিশেষ করে নামাযের মাসায়েল হলে সঙ্গে সঙ্গে তার সমাধান দিতে পারতেন।

সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ : মুহাদ্দিস সাহেব হুজুরের সর্বাধিক ঝেঁাক ছিল সাহিত্যের প্রতি। আরবী—উদুর্ সাহিত্য ছিল অবসরে প্রিয় সঙ্গী। গভীর রাতে উঠে তিনি অকৃত্রিম সুরে আরবী সাহিত্যের বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করতেন। কখনো কখনো কবিতা পড়তে পড়তে অশ্রম্নপ্লাবিত হতেন, হতেন ভারাক্রান্ত ও বাকরুদ্ধ।

অনাড়ম্বর জীবন—যাপন : তাঁর চালচলন ছিল অকৃত্রিম ও সাধাসিধে। পোশাক—পরিচ্ছদ ছিল একেবারেই মামুলি। তিনি নিজেকে অপরিচিত রাখার উদ্দেশ্যে সাধারণত পোশাক পরিধান করতেন। এ ক্ষেত্রে তার আদর্শ পুরুষ ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতুবি রহ.। মাওলানা কাসেম নানুতুবির প্রসিদ্ধ উক্তিটি তিনি মাঝে মাঝে ছাত্রদেরকে বলতেন, ‘যদি কাসেম আলেম না হতো, তবে কাসেম নামে কোনো ব্যক্তি আছে বলে দুনিয়ার কেউ জানত না।’

কোথাও সফর করলে একটি ব্যাগ নিজেই হাতে করে নিয়ে যেতেন, সঙ্গে কোনো খাদেম নিতেন না। তিনি বলতেন, ‘কিছু অর্জন করতে হলে নিজেকে বিলীন করতে হবে।’ চৌকিতে কখনো তোষক ব্যবহার করেননি। অবশ্য অন্তিমকালে তাঁর এক শিষ্য একটি তোষক এনে অনুরোধ জানালে কিছুদিনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সারা জীবনই কাটিয়ে গেছেন একটি টিনসেড ঘরে। অথচ আলিশান দালানে থাকার মতো তাঁর বহু সুযোগ ছিল। হযরতের একটি শখ ছিল নিজ হাতে রান্না করে খাওয়া। মাঝে মাঝে এই রান্না—বান্নায় ছাত্রদেরকেও শরীক করতেন। আশি/এক শ জন পর্যন্ত শরীক হতো হযরতের রান্নায়। সবার তরকারি রান্না করতেন নিজ হাতে। আবার নিজ হাতে বণ্টন করে দিতেন সবাইকে। এসব দিনগুলো আজও স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে হযরতের অনুরক্তদের হৃদয় পাতায়, ভাবনার আকাশে।

তাঁর হাতে গড়া ছাত্র—শিষ্য : হযরতের তালীম ও তারবিয়াতের ছেঁায়ায় গড়ে উঠেছে দেশ—বিদেশে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ওয়ায়েজ, গবেষক, লেখক, সাহিত্যিকের এক বিরাট কাফেলা। যারা সকলেই গর্বিত হযরত মুহাদ্দিস সাহেবের ছাত্র হতে পেরে। হযরতের সেসব স্নেহধন্য ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন :
১। মাওলানা মুতিউর রহমান, মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুহতামিম, ফরিদাবাদ মাদরাসা। ২। মুফতী আবূ সাঈদ, মুফতী, ফরিদাবাদ মাদরাসা; পরিচালক, দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদ, ঢাকা। ৩। মাওলানা ইসমাঈল সাহেব, প্রাক্তন নাযেমে ইমতিহান, বেফাকুল মাদারিস, বাংলাদেশ। ৪। মাওলানা আব্দুস সামাদ ফরিদী রহ.। ৫। মাওলানা সিদ্দীকুর রহমান সাহেব, মুহাদ্দিস, জামিয়া রহমানিয়া। ৬। মাওলানা জাফর আহমদ, মুহাদ্দিস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ। ৭। মাওলানা ইমদাদুল ইসলাম, মুহতামিম, জামালুল কোরআন মাদরাসা। ৮। মুফতী আব্দুস সালাম, মুহাদ্দিস, ফরিদাবাদ মাদরাসা, ঢাকা। ৯। মাওলানা জিকরুল্লাহ খান, মুহাদ্দিস, ফরিদাবাদ মাদরাসা, ঢাকা।
আখেরাতের ধ্যানমগ্নতা ও ইবাদত—বন্দেগী : তিনি তাহাজ্জুদগুজার ছিলেন। মাগরিবের পর দীর্ঘক্ষণ আওয়াবীন নামাযে মগ্ন থাকতেন। ছাত্রদেরকে জামাতে নামায আদায়ের জন্য খুব তাগিদ করতেন। এমনকি সকল ছাত্র ফজরের পূর্বে উঠে অন্তত দু—রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তে পারে সে জন্য বার বার নিজের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করতেন। আখেরাতের চিন্তা তাঁর অন্তরে এত প্রবল ছিল যে, কথাবাতার্য় তা প্রকাশ পেত। প্রায়ই তিনি এ হাদীসটি বলতেন, যার মর্মার্থ হলো, ‘যে ব্যক্তি সব চিন্তা বাদ দিয়ে আখেরাতের চিন্তায় মগ্ন থাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুনিয়ার সমস্ত সমস্যা সমাধান করে দেন।’

আখেরাতের ভয়ে ভীত হয়ে বলতেন, ‘হায়! ওপারের কিছু খবর যদি একটু জানতে পারতাম, কী অবস্থা হবে?’ সত্যিকার অর্থেই তাঁর সান্নিধ্যে বসলে অন্তরে ভাবনা সৃষ্টি হতো আখেরাতের।

অবশেষে : নিভৃতচারী এই সাধক পৃথিবীর সকল মায়াকে ঠেলে আপন স্রষ্টার ডাকে সাড়া দেন। তাঁর মৃত্যুতে কেঁদে ওঠে সকল শিষ্য—ভক্তের হৃদয়। তাঁকে হারিয়ে ইলমে নববীর গুঞ্জনে মুখরিত ফরিদাবাদ জামিয়া কেমন নিবার্ক হয়ে পড়ে। যেন তা আজও তাঁর মৃত্যুতে শোক পালন করছে।

খতীবে মিল্লাত আতাউর রহমান খান রহ.
[ষষ্ঠ মুহতামিম]

জন্ম :
এ মনীষী ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানাধীন হাতকবিলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা আহমদ আলী খান রহ. ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক রাহবার, স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী হুকুমত কায়েমের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা মাওলানা আতহার আলী রহ.—এর প্রধান খলীফা এবং ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের আজীবন মুহতামিম।

শিক্ষাজীবন :
মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ. প্রাথমিক শিক্ষা নিজ পিতার কাছেই অর্জন করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজ বাড়ি সংলগ্ন জামিয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনের মুহূর্তগুলো তিনি একাগ্রচিত্তে মুতালাআয় মশগুল থাকতেন। জামাতের ছাত্ররা তাঁর তাকরারে বসার জন্য বেশি আগ্রহী থাকত। এ সময়ে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ মাওলানা আতহার আলী রহ.—এর সোহবত লাভ করেন। তিনি ডায়েরিতে লেখেন, ‘তাঁকে (আতহার আলী রহ.) আমি বাল্যকাল থেকে নিয়ে যতদিন দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন ততদিন দেখেছি, তাঁর সঙ্গে থেকেছি এবং একেবারে ছায়ার মতো তাঁর অনুসরণ করেছি, তাঁর কাছেই আলিফ বা—এর সবক নিয়েছি। দাওরা পর্যন্ত তাঁর কাছেই তাঁর মাদরাসায় লেখাপড়া করেছি।’
শিক্ষকতা :
১৯৬২ সালে লেখাপড়া সমাপ্তির পর মাওলানা আতহার আলী রহ.—এর নির্দেশ ও শ্রদ্ধেয় উস্তাদগণের পরামর্শে জামিয়া ইমদাদিয়ায় উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ পান। একাধারে ৪০ বছর জামিয়ার উস্তাদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন। অত্যন্ত সুচারুরূপে দরস দিতেন। ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্রও ভালোভাবে কিতাব বুঝতে পারত। তাঁর এক ছাত্র বলেন, হুজুর অত্যন্ত সুন্দর করে তাকরীর করতেন, কোনো জটিল বিষয় সামনে এলে বারবার বুঝিয়ে বলতেন। তাঁর দরসে ছাত্ররা খুব মনোযোগ সহকারে তাকরীর শুনত। তিনি ফরিদাবাদে থাকাবস্থায় নিষ্ঠার সাথে ইহতিমামের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতি ও শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত দরস দিতেন।

রাজনৈতিক জীবন :
মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ. যেমন ছিলেন যুগসচেতন আলেম তেমনি ছিলেন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। ১৯৯১ সালে কিশোরগঞ্জ সদর থেকে বিপুল ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনীতির শিক্ষা অর্জন হয়েছিল স্বীয় উস্তাদ ও মুরব্বী, বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অগ্রদূত মাওলানা আতহার আলী রহ.—এর দীর্ঘদিনের সোহবত ও সং¯্রব থেকে। তিনি ডায়েরিতে লেখেন, ‘যে বছর আমি ফারেগ হলাম সে বছরই তিনি (মাওলানা আতহার আলী রহ.) আমাকে তাঁর মাদরাসার মুদাররিস হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর সাথে আন্দোলনে সারা দেশ সফর করেছি তাঁর পিএস হিসাবে।’ তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন তাঁর দুই গুরু মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্র হয়ে ঢাকার রাজপথে ছুটে বেড়ান, তিনি তখন নেজামে ইসলামী পার্টির শীর্ষ নেতা মাওলানা আতহার আলী রহ.—এর একান্ত সহচর ও রাজনৈতিক মুখপাত্র হয়ে সারা বাংলাদেশে শত শত সভা সমাবেশে বন্দুকের নলের মুখে অগ্নিঝরা বক্তব্যের স্ফুলিঙ্গ ছড়ান।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট। সে সময় দলের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বের হয়ে তাঁর নেতাকে একটি পত্র লিখেছিলেন। যার সারকথা ছিল, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে। এ জন্যই আমরা মুসলমানদের নিয়ে এর পক্ষে ছিলাম। সেই আদর্শ পাকিস্তান ধরে রাখতে পারেনি, তারা জালিম। তারা নিরপরাধ মানুষকে মারছে। গবাদী পশু, গাছপালা নষ্ট করেছে। জনপদ ধ্বংস করছে। শিশুহত্যা করছে। নারী নির্যাতন করছে। একজন মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠলেই যেখানে কিছু করার থাকে না সেখানে গোটা বাংলাদেশকে জোর—যুলুম করে দাবিয়ে রাখা কী করে সম্ভব। দেশ স্বাধীন হবেই। এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিন। একটি ঐতিহাসিক ভুলের সাথে সাথে জাতির কাছে আলেম সমাজকে ছোট বানানোর পক্ষপাতি আমি নই।’

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নেযামে ইসলামী পর্টির সহ—সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বৃহত্তর ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

কর্মমুখর জীবন ও অভিভাবকরূপে :
মাওলানা আতাউর রহমান খান যেমন ছিলেন একজন দক্ষ পরিচালক তেমনি একজন পিতৃতুল্য অভিভাবক। তিনি একাধারে ৪০ বছর জামিয়া ইমদাদিয়ায় নিষ্ঠার সাথে হাদীসের দরস দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন দীনি মাদরাসার কর্তৃপক্ষের অনুরোধে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জামিয়া ইমদাদিয়া মাদরাসায় বিচক্ষণতার সাথে ২০ বছর নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। ময়মনসিংহের জামিয়া ইসলামিয়ায় যাওয়ার মুহূর্তে আতহার আলী রহ. তাঁর ওপর আস্থা রেখে বলেছিলেন, ‘মাদরাসা, মসজিদের তদারকির জন্য তুমি থাকো। এটাকে কীভাবে চালু করা যায় তার জন্য তুমি কাজ করো।’ তিনি একাধারে নয় বছর বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার (বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা বোর্ড) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আমৃত্যু ভাইস চেয়ারম্যানের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯০ সালে ফরিদাবাদ মাদরাসায় মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করে মাদরাসাকে খুব দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর তত্ত্বাবধানেই মাদরাসার দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধার হয়। ২০০৩ সালে দারুল উলূম মীরপুর—৬ এর মুহতামিম পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৯১—১৯৯৬ সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি বোর্ড অব গভর্নরস ইসলামী ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ধর্ম মন্ত্রণালয়—সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ লাইব্রেরী কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশনের ইসলামী বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদ এবং আল—কোরআনুল কারীম বঙ্গানুবাদ পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তাঁর হাতে গড়া :
সারা দেশের কওমী মাদরাসাগুলোকে একতাবদ্ধ করতে এবং কালের দাবি পূরণে এই শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে যে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার আত্মপ্রকাশ এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। দেশের বিভিন্ন মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল, প্রিন্সিপাল ও মুরুব্বি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবশেষে তিনি নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে তাঁর উন্নত চিন্তার আলোকে দরসে নেযামি ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে একদল সুনাগরিক গড়ার লক্ষে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্বপ্নের আলোকে গড়া মাদরাসাটির নাম জামিয়া ফারূকিয়া। বর্তমানে তাঁর তৃতীয় পুত্র ড. খলিলুর রহমানের তত্ত্বাবধানে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।

উত্তরসূরিদের উদ্দেশে :
শত বিভক্ত ইসলামী দলগুলোর সমন্বয় সাধন এবং ওলামায়ে কেরামের প্রতি ঐক্যের অসিয়ত করে যান এ কথাটুকু বলে যে, আমার একটা ধারণা, আমাদের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যে অনৈক্য, ওলামাদের মধ্যে যে দূরত্ব, রাষ্ট্র পরিচালক ও রাজনীতিকদের মধ্যে যে দূরত্বÑএটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ। সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হলে আমাদের দুটি জিনিসের প্রয়োজন : এক. আমরা কী চাই তা ঠিক করতে হবে। দুই. টার্গেট অব লাইফ। জীবনের একটা টার্গেট ঠিক করতে হবে। টার্গেটে উপনীত হওয়ার জন্য আমাদের যদি কিছু ত্যাগ করতে হয় সেটাও করতে হবে। এই দুটি যদি পাশাপাশি আসে তাহলে আমরা কাজ করতে পারব। তিনি আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলেন, এ জন্য আমার পরামর্শ আমাদের দেশে যত ইসলামী দল আছে তাদের এক নম্বর, তিন নম্বর এই ক্যাটাগরীর নেতাদের এক চিল্লা করে তাবলীগ জামাতে যাওয়া দরকার। তাবলীগে এক চিল্লা দিয়ে রাজনীতি করুক দেখবেন, রাজনীতির অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। চিল্লা লাগিয়ে আসুক, দেখবেন তারা এক সাথে কাজ করতে পারছে, এক পাতে ভাত খেতে পারছে।

অবশেষে :
৩১ জুলাই ২০০৮ সালে এ ব্যস্ত পৃথিবী থেকে অবসর নিয়ে আপন প্রভুর ডাকে সাড়া দেন। এ ক্লান্ত—শ্রান্ত মুসাফিরকে ¯্রষ্টা তাঁর রহমতের দয়ায় সিক্ত করুন। আমীন।

শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল কুদ্দুছ দা. বা.
[বর্তমান মুহতামিম]

জন্ম ও বংশ পরিচয় :
তিনি কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানার বিজয়পুর গ্রামে ১৯৫৫ সালের ১লা জানুয়ারি, বাংলা ১৩৬১ সালের ৫ মাঘ রোজ মঙ্গলবার রাতের প্রথম প্রহরে এক ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ বাদশা মিঞা। মা কুলছুম বেগম।
শৈশবকাল ও ছাত্রজীবন :
মাত্র চার বছর বয়স থেকেই মক্তবে যেতে শুরু করেন। মক্তব শেষ করে মুড়াবাজাল মাদরাসায় ভর্তি হন। হাফেয ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের কাছে নয় বছর বয়সে কোরআন হেফজ শুরু করেন। এগারো বছর বয়সে সম্পূর্ণ করেন। সেখানেই তাইসীর ও মিযান পড়েন। এরপর ওলামা বাজার মাদরাসায় নাহবেমীর পড়েন শায়খুল হাদীস আল্লামা নূরুল ইসলাম (আদীব সাহেব হুজুর) সাহেব—এর সান্নিধ্যে। পরবর্তীতে মেখল মাদরাসায় হেদায়াতুন্নাহু ও কাফিয়া পড়েন। মুফতীয়ে আযম ফয়জুল্লাহ রহ., মুফতী সাইফুল্লাহ সন্দীপী রহ. ও মুফতী আযীযুর রহমান রহ.—এর মতো দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরামের ছাত্র হবার গৌরব অর্জন করেন। শরহেজামী থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত একটানা ছয় বছর হাটহাজারী মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। ১৯৭৭ সালে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার পর বেশ কিছুদিন সেখানে তাফসীরের ওপর বিশেষ কোর্স করেন। এ সময় তিনি শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল কাইয়ূম রহ., আল্লামা আব্দুল আযীয রহ. ও আল্লামা আহমদ শফি দামাত বারাকাতুহুম—এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছে পড়ার গৌরব অর্জন করেন।
কৃতিত্ব :
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো উস্তাদগণের দুআ। তাঁর সম্পর্কে হাটহাজারী মাদরাসার শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আযীয রহ. বলেন, গোটা শিক্ষকতা জীবনে আমি মাত্র তিন জন মেধাবী ও খাঁটি ছাত্র পেয়েছি। আব্দুল কুদ্দুছ তাঁদের অন্যতম। এ ছাড়া তিনি হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম আব্দুল ওয়াহহাব রহ.—এর একান্ত খাদেমও ছিলেন। তিনি পুরো জীবনে কোনো শ্রেণিতেই ১ম স্থান হারাননি।

চালচলনের বিশেষত্ব :
ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। সর্বদা লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। মাদরাসার নিধার্রিত ছুটি ছাড়া গোটা ছাত্রজীবনে মাত্র দুবার আবেদন করে ছুটি নিয়েছেন। ছুটিতে বাড়ি এসেও লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। যে দুবার তিনি আবেদন করে ছুটি নিয়েছিলেন সে সময় বাড়ি এসে এত পরিমাণ মুতালাআ করেন যে, মাদরাসায় ফিরে এসে সে পরিমাণ পড়া শেষ হতে প্রায় সপ্তাহখানেক লেগেছিল।

তাসাওফ ও আত্মশুদ্ধি :
হাটহাজারী মাদরাসায় থাকাকালেই শায়খুল হাদীস আল্লামা আব্দুল আযীয রহ.—এর হাতে বায়আত হন। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে খেলাফতও লাভ করেন। এ ছাড়াও হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ.—এর সর্বশেষ খলীফা হযরত মাওলানা আবরারুল হক রহ. এবং শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর বিশিষ্ট খলীফা, হাটহাজারী মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম আল্লামা শাহ আহমদ শফি দামাত বারাকাতুহুম থেকেও খেলাফত লাভ করেন।

কর্মজীবন :
তিনি শিক্ষকতার মাধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালে যশোর রেলস্টেশন জামিয়া এজাযিয়া মাদরাসায় মিযান থেকে দাওরা পর্যন্ত প্রায় সকল জামাতে দরস দান করেন। ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ জেলা শহরে অবস্থিত জামিয়া আশরাফিয়া মাদরাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি বুখারী, মুসলিম ও তাফসীরে বায়যাভীসহ আরও অন্যান্য কিতাবের দরস দেন। ১৯৮০ সালে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় আসেন, এখানে আবূ দাউদসহ অন্যান্য কিতাবাদি পড়ান। যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় থাকাকালে গোলাপবাগ জামে মসজিদের ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অদ্যাবধি আঞ্জাম দিয়ে আসছেন। ১৯৮৫ সালে ফরিদাবাদ মাদরাসায় নিয়োগ লাভ করেন এবং নিয়মিত দরস দিতে থাকেন। মাত্র এক বছর পরই মজলিসে শূরা তাঁর ওপর মাদরাসার শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তাঁর অসাধারণ দক্ষতা, প্রতিভা, নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পেয়ে ১৯৯৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ফরিদাবাদ জামিয়ার মজলিসে শূরার এক অধিবেশনে তাঁকে মুহতামিমের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন। অবশেষে স্বীয় মুর্শিদ, ফরিদাবাদ জামিয়ার প্রধান মুরুব্বী আল্লামা আব্দুল আযীয রহ. এর অভয়বাণী শুনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দীনের খাতিরে সে সিদ্ধান্ত মেনে নেন। আলহামদুলিল্লাহ অদ্যাবধি ন্যায়—নিষ্ঠা, সততা, সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সাথে এ খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিভিন্ন দীনি কাজের সাথে জড়িত আছেন। গোলাপবাগ ইমদাদুল উলূম মাদরাসা, বিজয়পুর আযীযুল উলূম মাদরাসার সাথে জড়িত আছেন। এ ছাড়া হাটহাজারী মাদরাসা, জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, ঢাকা বড় কাটারা মাদরাসা, আরজাবাদ মাদরাসা ও সাভার রাজফুলবাড়ীয়া মাদরাসাসহ দেশের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের মজলিসে শূরার সদস্য। দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

শেষ কথা :
আল্লামা আব্দুল কুদ্দুছ দা. বা. শুধু আমাদের আধ্যাত্মিক পিতাই নন তিনি গোটা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আধ্যাত্মিক রাহবার। তাঁর দীনি খেদমত শুধু মাদরাসার ভেতরেই নয় বরং তাঁর ঘটনাবহুল জীবন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিব্যাপ্ত। তাঁর কঠোর প্রচেষ্টা, ত্যাগ—তিতিক্ষা ও আধ্যাত্মিক মুজাহাদার কারণে তিনি মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসন দখল করে আছেন। মেধা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, উদারতা, বদান্যতা ও খোদাভীতিতে পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব পেয়ে আমরা তাঁর ছাত্ররা নিজেদের ধন্য মনে করি। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে দেশ, জাতি তথা মুসলিম উম্মাহর সফলতার দ্বার উন্মোচন করুন এবং তাঁর বরকতের ছায়া আমাদের ওপর প্রলম্বিত করুন। আমীন।

খতীব মাওলানা উবাইদুল হক রহ.
[দ্বিতীয় শায়খে সানী]

তিনি ১৯২৮ সালে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ থানাধীন বারঠাকরীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে নিজ গৃহে পিতা হাফেয মাওলানা জহুরুল হকের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য ১৪ বছর বয়সে দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানেই কাফিয়া থেকে ইলমের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেন।

উস্তাদবৃন্দ :
তঁর প্রসিদ্ধ উস্তাদবৃন্দ হলেন, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ., হযরত মাওলানা ইবরাহীম বালিয়াভী রহ., মাওলানা এজায আলী রহ. প্রমুখ।

আধ্যাত্মিকতা :
তাফসীর বিভাগে অধ্যয়নকালে হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.—এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। অতঃপর মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.—এর হাতে, এরপর মাওলানা আবরারুল হক রহ.—এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। তিনি হাফেজ্জী হুজুর রহ. থেকে খেলাফত লাভ করেছিলেন।

কর্মজীবন :
তিনি তাঁর নেক হায়াতে বহুবিধ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। তার মধ্যে বড় কাটারা মাদরাসা, আজিমপুর ফয়জুল উলূম, পটিয়া মাদরাসা, ঢাকা আলিয়া ও ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদরাসায় হাদীসের দরস দিয়েছেন। এ ছাড়া ১৯৮৪ সাল থেকে শেষ নিঃশ্বাস অবধি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের খতীব পদে সমাসীন ছিলেন।

দেশ সফর :
তিনি সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সরকারি—বেসরকারি সফরে গমন করেন।

সম্মান ও মূল্যায়ন :
মাওলানা উবাইদুল হক বাংলাদেশের ওলামা ও জনসাধারণের নিকট অতিব সম্মানের পাত্র ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় সীরাত কমিটি কতৃর্ক শ্রেষ্ঠ ইসলামী ব্যক্তিত্ব পুরস্কারে ভূষিত হন।

রাজনৈতিক জীবন :
যুগের ইসলামবিরোধী চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে ইসলামী দর্শন বাস্তবায়নে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। খতীব উবাইদুল হক রহ. বক্তৃতা, বিবৃতি ও লিখনীর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন।

খতমে নবুওয়াত আন্দোলন :
আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে খতীব মাওলানা উবাইদুল হক রহ. দেশের সর্বত্র কাদিয়ানীবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যান। সম্মেলন, মিটিং, মিছিল, বই—পুস্তক এবং লিফলেটের মাধ্যমে কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ও সংখ্যালঘু ঘোষণার চাপ সৃষ্টি করেন।
ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মাওলানা উবাইদুল হক ৬ অক্টোবর ২০০৭ মোতাবেক ২৪ রমযান ১৪২৮ হিজরী রাত সাড়ে এগারোটায় রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।