নাযেমে তালীমাত

বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত নাযেমে তালীমাত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুর রশীদ খান সাহেব। তাঁর সহযোগী হিসেবে আছেন, মাওলানা ফয়জুল্লাহ সাহেব।

নেসাবে তালীম ও নেযামে তালীমের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বস্তুত ইসলামী শিক্ষা ধারার সূচনা হয় নবী যুগে ‘দারে আরকাম’ থেকেই। মসজিদে নববীর চত্ত্বরের শিক্ষার্থীরা ‘আহলে সুফফাহ’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। সে সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শিক্ষক। হযরত সাহাবায়ে কেরাম রাযি. ছিলেন তাঁর ছাত্র। তখন প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির জ্ঞান আহরণের অতি প্রচীন ধারা তখন বলবৎ ছিল। অবশ্য ইসলামী চিন্তা—চেতনা ও কোরআনী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতৃর্ক বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষক প্রেরণের বর্ণনা হাদীস ও ইতিহাসে পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম কোরআন ও হাদীসের ইলম নিয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েন। সাহাবায়ে কেরামের যুগেই ইসলামী শিক্ষা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ভরতবর্ষেও ইসলামী শিক্ষার সূচনা ঘটে। যে সব সাহাবী ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ উতবান রাযি., আশইয়াম ইবনে আমর তামীমী রাযি., সোহার ইবনে আল আবদা রাযি., সোহাইল ইবনে আদী রাযি., হাকাম ইবনে আবুল আসসাকাফী রাযি., উবাইদুল্লাহ ইবনে মা’মার তামীমী রাযি., আব্দুর রহমান ইবনে সামুরাহ রাযি. এর নাম ইতিহাস ধারণ করে আছে। তবে সে সময় শিক্ষার মূল বিষয়বস্তু ছিল কোরআন ও হাদীস। কিন্তু উমাইয়া শাসনামলে [৪১ হিজরীÑ১৩০ হিজরী] হাদীস সংকলন ও যাচাই বাছাইয়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ‘রিজাল শাস্ত্র’ পাঠ্যসূচীর অন্তভূর্ক্ত হয়। আবার কোরআন বিশুদ্ধভাবে পাঠের প্রয়োজনে ইলমে কিরাতও পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত হয়। এ সময় বহির্বিশ্বে ইসলাম প্রসারের ফলে অনারবদেরকে আরবী ভাষা শিক্ষাদানের প্রয়োজন দেখা দেয়। কারণ, ইসলামের মৌলিক বিষয় কোরআন ও সুন্নাহর ভাষা আরবী। ফলে আরবী ভাষার নিয়ম—নীতি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবে ইলমে নাহু পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত হয়। এমনিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে ফিকহ তথা ইসলামী আইন, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, তর্কশাস্ত্র ও অলংকার শাস্ত্র ইত্যাদি ইসলামী শিক্ষা সিলেবাসের অন্তর্ভূক্ত হয়।
বাদশাহ মামুনের যুগে ইসলামী দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশের জ্ঞান বিজ্ঞানের সমাহার ঘটার ফলে ভূগোল, জ্যামিতি, সৌরবিজ্ঞান, রসায়ন, বস্তু বিজ্ঞান, গণিত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষা ও ইসলামী শিক্ষার সাথে অনেকখানি ঐচ্ছিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। তাবেয়ীদের যুগ পর্যন্ত পাঠ্যসূচীতে কোরআন, হাদীস, রিজাল শাস্ত্র ও ইলমে নাহু এসব বিষয়ই অন্তর্ভূক্ত থাকে এবং মসজিদে নববীর অনুকরণে মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাই সর্বত্র প্রচলিত হয়। যেখানেই কোনো মসজিদ গড়ে উঠত সেখানেই মসজিদ কেন্দ্র করে একটি মক্তবও গড়ে উঠত। এভাবে মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে শিক্ষা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। কেননা, যেখানেই মুসলিম বসতি গড়ে উঠত সেখানেই মসজিদ গড়ে উঠত অনিবার্যভাবে। তার সাথে গড়ে উঠত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ৪০০ হিজরী পর্যন্ত মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা মসজিদ ভিত্তিকই ছিল। সর্বপ্রথম মিসরের শাসনকর্তা বাদশাহ হাকেম বিআমরিল্লাহ [৩৮৫হিজরীÑ৪১১ হিজরী] মসজিদ থেকে পৃথক করে শিক্ষার জন্য একটি আলাদা গৃহ নির্মাণ করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু তা টিকে থাকেনি। পরবর্তীতে আফগান শাসক সুলতান মাহমুদ ৪১০ হিজরীতে রাজধানী গজনীতে একটি সুবিশাল মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদ সংলগ্ন স্থানে শিক্ষার জন্য একটি পৃথক গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকরা এটিকেই মসজিদ থেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মাদরাসা বলে মনে করেন। তবে অনেকেই বাদশাহ নিজামুল মুলক তুসী [মৃত্যু : ৪৮৫ হিজরী/১০৯২ খ্রিস্টাব্দ] কতৃর্ক প্রতিষ্ঠিত বাগদাদের মাদরাসায়ে নিযামিয়াকে সর্বপ্রথম মাদরাসা বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে সুলতান মাহমুদের অনুকরণে দেশের আমীর—উমারা ও পরবর্তী স¤্রাটগণ ব্যাপক হারে মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। তখন পর্যন্ত মাদরাসার ব্যয়ভার সরকারই বহন করত। অবশ্য ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকার জনগণ এ সকল প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অর্থানোকূল্য প্রদান করতে পারাকে নিজেদের জন্য সৌভাগ্য মনে করত।

হিজরী সপ্তম শতক থেকে নবম শতক পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে সে সব বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল সেগুলো নিম্নরূপ :
ইলমে নাহু :
মিসবাহ, কাফিয়া, লুব্বুল আলবাব, ইরশাদ ইত্যাদি।
ইলমে ফিকহ : হিদায়াহ।
উসূলে ফিকহ : মানার, শরহে মানার, উসূলে বাযদবী।
তাফসীর : মাদারেক, বায়যবী, কাশশাফ।
হাদীস শাস্ত্র : মাশারেফুল আনওয়ার, মাসাবীহুস সুন্নাহ।
আরবী সাহিত্য : মাকামাত।
মানতেক শাস্ত্র : শরহে শামসিয়্যাহ।
কালাম শাস্ত্র : সাহাইফ, তামহীদে আবু শুকুর সালেমী।
তাসাউফ : আওয়ারিফ, নকদুন নুসূস, লামআত ইত্যাদি।
নবম শতকের পর থেকে আরও যে সকল কিতাব পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত হয় তা হলো, কাজী ইযযুদ্দীন প্রণীত মাতালে মাওয়াকেফ, মিফতাহুল উলূম, মুত্তাওয়াল, মুখতাসার, তালবীহ, শরহে আকাইদ, শরহে বেকায়াহ, শরহে জামী ইত্যাদি।